মুন টাইমস নিউজ

রাজনীতি

স্লোগান নয়, সমাধানের রাজনীতিতে আগ্রহী তরুণরা

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ফটো কার্ড
স্লোগান নয়, সমাধানের রাজনীতিতে আগ্রহী তরুণরা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত ধারণা ছিল, নতুন প্রজন্ম রাজনীতি নিয়ে খুব একটা ভাবে না। বিশেষ করে জেন-জি নাকি রাজনীতিবিমুখ, ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিজীবন নিয়েই তাদের ব্যস্ততা। জুলাই ২০২৪ সেই ধারণাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজপথ, অনলাইন থেকে অফলাইন—তরুণদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে এই প্রজন্ম শুধু রাজনীতি নিয়ে কথা বলে না, গতিপথও বদলে দিতে পারে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তরুণরা কি সত্যিই প্রচলিত ধারার রাজনীতি চায়?

জুলাইয়ের পর তরুণদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন অরাজনৈতিক তরুণদের সঙ্গে কথা বলে বিষয় স্পষ্ট হয়: তারা রাজনীতিবিমুখ নয়, আসলে তারা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি অনাগ্রহী।

এর পক্ষে সাম্প্রতিক তথ্যও আছে। ২০২৫ সালে দুই হাজার তরুণের ওপর সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ৮২.৭ শতাংশ উত্তরদাতা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে আগ্রহী নন। তবে এর কারণ হিসেবে ৫৮.৭ শতাংশ রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিক্রিয়ার ভয় এবং ৫৬.৪ শতাংশ দুর্নীতি ও রাজনীতিতে নৈতিকতার ঘাটতির কথা বলেছেন।

আবার একই সময়ে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) 'ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৫'-এ ১৮-৩৫ বছর বয়সী ২,৫৪৫ তরুণের মধ্যে রাজনীতির প্রতি স্পষ্ট আগ্রহ ও মতাদর্শগত বিভাজন দেখা গেছে। বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের প্রতি সমর্থন থাকলেও প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ তখনও সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। অর্থাৎ তরুণরা নিজেদের পছন্দ নিয়ে ভাবছে এবং প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে থাকার সিদ্ধান্তও নিচ্ছে।

তরুণদের রাজনৈতিক চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা বিমূর্ত প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান দেখতে চায়। বিওয়াইএলসির ২০২৫ সালের জরিপে দুর্নীতি দূরীকরণকে ৬৭.১ শতাংশ, বেকারত্বকে ৫৫.৯ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে ৪৩.৪ শতাংশ এবং আইনশৃঙ্খলাকে ২৩.৫ শতাংশ তরুণ আগামী পাঁচ বছরের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সংখ্যাগুলো দেখাচ্ছে, তরুণদের কাছে রাজনীতি এখন শুধু ডান-বাম, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও কোনো ঐতিহাসিক ইস্যুর বিতর্ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। তাদের কাছে রাজনীতি অনেক বেশি বাস্তবমুখী। তারা জানতে চায়—চাকরি কোথায়? বাজারের মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে? ভূমি অফিসে নামজারি করতে কেন দিনের পর দিন ঘুরতে হবে? থানায় সেবা পেতে পরিচিত লোক কেন লাগবে? গণপরিবহনে ভোগান্তি কমবে কীভাবে? সরকারি হাসপাতালের সেবা কীভাবে সহজ হবে?

এই জায়গা থেকেই মনে হয়েছে, তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, যাকে অ্যাকশনেবল পলিটিক্স বলা যায়; অর্থাৎ এমন রাজনীতি, যার প্রতিটি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব কাজের পরিকল্পনা থাকে।

এই প্রজন্মের রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরনও আলাদা। ইনোভেশনের ২০২৫ সালের ন্যাশনাল পোলে দেখা যায়, জেন-জি ভোটারদের মধ্যে ভোটসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ২৪.৪ শতাংশ, পক্ষান্তরে মিলেনিওালদের ক্ষেত্রে তা ১৮.১ শতাংশ। একই জরিপে জেন-জির ৩৩.৬৪ শতাংশ তখনও ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়নি, যা অন্য বয়সী গোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। সহজ করে বললে, তরুণরা শুধু নেতার মিছিল দেখতে আগ্রহী নয়, তারা নেতার বক্তব্য শুনতে চায়। শুধু পোস্টার নয়, পরিকল্পনা দেখতে চায়। শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, সঙ্গে জানতে চায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কীভাবে হবে।

এখানেই প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের বড় সংঘাত। ‘অমুক ভাই, তমুক ভাই’ সংস্কৃতি, নেতার সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, নেতার গাড়ির পেছনে দৌড়ানো, অতিরিক্ত মিছিল, পোস্টার, মাইকিং ও নেতাকে ঘিরে ব্যক্তিপূজা—এসবের প্রতি তরুণদের আগ্রহ একেবারেই তলানিতে। তার বদলে তারা পডকাস্ট, অনলাইন সাক্ষাৎকার, রিলস, ডেটাভিত্তিক আলোচনা, বিতর্ক এবং সরাসরি প্রশ্নোত্তরকে বেশি গ্রহণ করছে। যার ফলে যোগাযোগের পরিবর্তনের সঙ্গে নেতৃত্বের ধারণারও পরিবর্তন হয়েছে।

তবে এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তাও আছে। তরুণদের সব প্রত্যাশাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড ভেবে ভুল করলে চলবে না। শুধু তরুণ মুখ, নতুন লোগো ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইন দিয়ে নতুন রাজনীতি তৈরি হয় না। বিআইজিডির ২০২৪ সালের গবেষণাতেও দেখা গেছে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে জনমত বিভক্ত ছিল; সমর্থকদের কাছে নতুন চিন্তা, সাহস ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংশয়বাদীরা অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।

তাই নতুন রাজনীতির প্রথম কাজ হওয়া উচিত বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তার সমাধানের সক্ষমতা তৈরি করা। কোনো রাজনৈতিক নেতা যদি বলে ভূমি অফিসের সেবা সহজ করবে, তাহলে তাকে দেখাতে হবে কীভাবে করবে। যদি দ্রব্যমূল্য কমানোর কথা বলে, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার মনিটরিং ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা দিতে হবে। যদি বেকারত্ব নিয়ে কথা বলে, তাহলে শুধু চাকরির সংখ্যা নয়—দক্ষতা, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনাও সামনে আনতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি সমস্যার বিপরীতে অ্যাকশন প্ল্যান বা সমাধানের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখাতে হবে।

এক্ষেত্রে রাজনীতির ভাষাটা বদলানো জরুরি। নেতাকে সবজান্তা অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপনের বদলে তাকে জবাবদিহিমূলক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নির্বাচনি ইশতেহারকে কেবল প্রতিশ্রুতির বই না বানিয়ে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, সময়সীমা এবং অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

জুলাই প্রজন্ম আমাদের একটি জিনিস অন্তত শিখিয়েছে, তরুণদের অবমূল্যায়ন করা বিপজ্জনক। তারা রাজনীতি বোঝে না, ধারণাটি ভুল। তারা রাজনীতি বুঝতে চায় নিজেদের বাস্তব জীবন দিয়ে।

প্রচলিত দলগুলোর কাছে প্রশ্নটি এখন আর ‘তরুণরা রাজনীতি সচেতন কি না’ না হয়ে, 'তরুণরা যে রাজনীতি চায়, সেই রাজনীতি করার মতো সক্ষমতা রাজনৈতিক দলগুলোর আছে কি না'—সে আত্মসমালোচনা করা উচিত।

তরুণদের এই মনস্তত্ত্ব যত দ্রুত রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারবে, বাংলাদেশের রাজনীতি তত দ্রুত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। আর আমরা যারা নতুন রাজনীতির কথা বলছি, তাদের জন্য সুযোগ আরও বড়। যদি আমরা স্লোগানের সঙ্গে সমাধান, ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে জবাবদিহিতা এবং মিছিলের প্রদর্শনী পরিহার করে বাস্তব কাজকে রাজনীতির কেন্দ্র করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

© প্রথম আলো  

Google Google -এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

আপনার মতামত লিখুন

মুন টাইমস নিউজ

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬


স্লোগান নয়, সমাধানের রাজনীতিতে আগ্রহী তরুণরা

প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত ধারণা ছিল, নতুন প্রজন্ম রাজনীতি নিয়ে খুব একটা ভাবে না। বিশেষ করে জেন-জি নাকি রাজনীতিবিমুখ, ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিজীবন নিয়েই তাদের ব্যস্ততা। জুলাই ২০২৪ সেই ধারণাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজপথ, অনলাইন থেকে অফলাইন—তরুণদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে এই প্রজন্ম শুধু রাজনীতি নিয়ে কথা বলে না, গতিপথও বদলে দিতে পারে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তরুণরা কি সত্যিই প্রচলিত ধারার রাজনীতি চায়?

জুলাইয়ের পর তরুণদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন অরাজনৈতিক তরুণদের সঙ্গে কথা বলে বিষয় স্পষ্ট হয়: তারা রাজনীতিবিমুখ নয়, আসলে তারা প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি অনাগ্রহী।

এর পক্ষে সাম্প্রতিক তথ্যও আছে। ২০২৫ সালে দুই হাজার তরুণের ওপর সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ৮২.৭ শতাংশ উত্তরদাতা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে আগ্রহী নন। তবে এর কারণ হিসেবে ৫৮.৭ শতাংশ রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিক্রিয়ার ভয় এবং ৫৬.৪ শতাংশ দুর্নীতি ও রাজনীতিতে নৈতিকতার ঘাটতির কথা বলেছেন।

আবার একই সময়ে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) 'ইয়ুথ ম্যাটার্স সার্ভে ২০২৫'-এ ১৮-৩৫ বছর বয়সী ২,৫৪৫ তরুণের মধ্যে রাজনীতির প্রতি স্পষ্ট আগ্রহ ও মতাদর্শগত বিভাজন দেখা গেছে। বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের প্রতি সমর্থন থাকলেও প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ তখনও সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। অর্থাৎ তরুণরা নিজেদের পছন্দ নিয়ে ভাবছে এবং প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে থাকার সিদ্ধান্তও নিচ্ছে।

তরুণদের রাজনৈতিক চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা বিমূর্ত প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান দেখতে চায়। বিওয়াইএলসির ২০২৫ সালের জরিপে দুর্নীতি দূরীকরণকে ৬৭.১ শতাংশ, বেকারত্বকে ৫৫.৯ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে ৪৩.৪ শতাংশ এবং আইনশৃঙ্খলাকে ২৩.৫ শতাংশ তরুণ আগামী পাঁচ বছরের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সংখ্যাগুলো দেখাচ্ছে, তরুণদের কাছে রাজনীতি এখন শুধু ডান-বাম, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও কোনো ঐতিহাসিক ইস্যুর বিতর্ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। তাদের কাছে রাজনীতি অনেক বেশি বাস্তবমুখী। তারা জানতে চায়—চাকরি কোথায়? বাজারের মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে? ভূমি অফিসে নামজারি করতে কেন দিনের পর দিন ঘুরতে হবে? থানায় সেবা পেতে পরিচিত লোক কেন লাগবে? গণপরিবহনে ভোগান্তি কমবে কীভাবে? সরকারি হাসপাতালের সেবা কীভাবে সহজ হবে?

এই জায়গা থেকেই মনে হয়েছে, তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, যাকে অ্যাকশনেবল পলিটিক্স বলা যায়; অর্থাৎ এমন রাজনীতি, যার প্রতিটি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব কাজের পরিকল্পনা থাকে।

এই প্রজন্মের রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরনও আলাদা। ইনোভেশনের ২০২৫ সালের ন্যাশনাল পোলে দেখা যায়, জেন-জি ভোটারদের মধ্যে ভোটসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা ২৪.৪ শতাংশ, পক্ষান্তরে মিলেনিওালদের ক্ষেত্রে তা ১৮.১ শতাংশ। একই জরিপে জেন-জির ৩৩.৬৪ শতাংশ তখনও ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়নি, যা অন্য বয়সী গোষ্ঠীর তুলনায় বেশি। সহজ করে বললে, তরুণরা শুধু নেতার মিছিল দেখতে আগ্রহী নয়, তারা নেতার বক্তব্য শুনতে চায়। শুধু পোস্টার নয়, পরিকল্পনা দেখতে চায়। শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, সঙ্গে জানতে চায় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কীভাবে হবে।

এখানেই প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের বড় সংঘাত। ‘অমুক ভাই, তমুক ভাই’ সংস্কৃতি, নেতার সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা, নেতার গাড়ির পেছনে দৌড়ানো, অতিরিক্ত মিছিল, পোস্টার, মাইকিং ও নেতাকে ঘিরে ব্যক্তিপূজা—এসবের প্রতি তরুণদের আগ্রহ একেবারেই তলানিতে। তার বদলে তারা পডকাস্ট, অনলাইন সাক্ষাৎকার, রিলস, ডেটাভিত্তিক আলোচনা, বিতর্ক এবং সরাসরি প্রশ্নোত্তরকে বেশি গ্রহণ করছে। যার ফলে যোগাযোগের পরিবর্তনের সঙ্গে নেতৃত্বের ধারণারও পরিবর্তন হয়েছে।

তবে এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সতর্কবার্তাও আছে। তরুণদের সব প্রত্যাশাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ড ভেবে ভুল করলে চলবে না। শুধু তরুণ মুখ, নতুন লোগো ও ডিজিটাল ক্যাম্পেইন দিয়ে নতুন রাজনীতি তৈরি হয় না। বিআইজিডির ২০২৪ সালের গবেষণাতেও দেখা গেছে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে জনমত বিভক্ত ছিল; সমর্থকদের কাছে নতুন চিন্তা, সাহস ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংশয়বাদীরা অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।

তাই নতুন রাজনীতির প্রথম কাজ হওয়া উচিত বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তার সমাধানের সক্ষমতা তৈরি করা। কোনো রাজনৈতিক নেতা যদি বলে ভূমি অফিসের সেবা সহজ করবে, তাহলে তাকে দেখাতে হবে কীভাবে করবে। যদি দ্রব্যমূল্য কমানোর কথা বলে, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার মনিটরিং ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা দিতে হবে। যদি বেকারত্ব নিয়ে কথা বলে, তাহলে শুধু চাকরির সংখ্যা নয়—দক্ষতা, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনাও সামনে আনতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি সমস্যার বিপরীতে অ্যাকশন প্ল্যান বা সমাধানের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখাতে হবে।

এক্ষেত্রে রাজনীতির ভাষাটা বদলানো জরুরি। নেতাকে সবজান্তা অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপনের বদলে তাকে জবাবদিহিমূলক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নির্বাচনি ইশতেহারকে কেবল প্রতিশ্রুতির বই না বানিয়ে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, সময়সীমা এবং অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

জুলাই প্রজন্ম আমাদের একটি জিনিস অন্তত শিখিয়েছে, তরুণদের অবমূল্যায়ন করা বিপজ্জনক। তারা রাজনীতি বোঝে না, ধারণাটি ভুল। তারা রাজনীতি বুঝতে চায় নিজেদের বাস্তব জীবন দিয়ে।

প্রচলিত দলগুলোর কাছে প্রশ্নটি এখন আর ‘তরুণরা রাজনীতি সচেতন কি না’ না হয়ে, 'তরুণরা যে রাজনীতি চায়, সেই রাজনীতি করার মতো সক্ষমতা রাজনৈতিক দলগুলোর আছে কি না'—সে আত্মসমালোচনা করা উচিত।

তরুণদের এই মনস্তত্ত্ব যত দ্রুত রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পারবে, বাংলাদেশের রাজনীতি তত দ্রুত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। আর আমরা যারা নতুন রাজনীতির কথা বলছি, তাদের জন্য সুযোগ আরও বড়। যদি আমরা স্লোগানের সঙ্গে সমাধান, ব্যক্তিপূজার পরিবর্তে জবাবদিহিতা এবং মিছিলের প্রদর্শনী পরিহার করে বাস্তব কাজকে রাজনীতির কেন্দ্র করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যিই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

© প্রথম আলো  


মুন টাইমস নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আলামিন সরকার
উপদেষ্টা: তাবিবুর রহমান তালুকদার
আইন উপদেষ্টা: এ্যাডঃ মোঃ মাহবুব আলম সরকার

© ২০২৬ মুন টাইমস নিউজ