মুন টাইমস নিউজ

জাতীয়

বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় দুই জাতীয় পুরস্কারজয়ীকে বিবিসিএফের সংবর্ধনা

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৬ অর্জন করায় আদনান আজাদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগে জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫ পাওয়ায় অধ্যাপক মো. হাসমত আলীকে সংবর্ধনা দিয়েছে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)।শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে বিবিসিএফ ও সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার (সোয়ান) যৌথভাবে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে কাজ করা বিবিসিএফের ৩১৪টির বেশি সংগঠন এবং ৩০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবীর উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়। আয়োজকরা বলছেন, এটি শুধু সংবর্ধনা নয়, দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংরক্ষণকর্মীদের আনন্দ ভাগাভাগিরও একটি উপলক্ষ।বিবিসিএফের সভাপতি ড. নাছির উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মো. আরাফাত রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিবিসিএফের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোল্যা রেজাউল করিম, উপদেষ্টা ড. এস এম ইকবাল, আইইউসিএন বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দিপু, বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বিবিসিএফের সহসভাপতি বাপ্পি খান, উপদেষ্টা অধ্যাপক টিপু সুলতান, কৃষিবিদ শহিদুর রহমান এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিবিসিএফের উপদেষ্টা ডা. আতিকুর রহমান মিঠু।জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মী আদনান আজাদ বলেন, এই স্বীকৃতি আমার একার অর্জন নয়। দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী, সহকর্মী ও সংগঠনের অবদানের ফল এ পুরস্কার।তিনি বলেন, শুধু বন্যপ্রাণী উদ্ধার করলেই সংরক্ষণ নিশ্চিত হয় না। প্রাণী ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে মানুষের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বন্যপ্রাণী সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।বিবিসিএফের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে আদনান আজাদ বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্থানীয় সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার সুযোগ তাকে মাঠের বাস্তবতা বুঝতে সহায়তা করেছে।অন্যদিকে জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. হাসমত আলী বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকৃতি সংরক্ষণে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, একটি গাছ, প্রজাপতি, পাখি কিংবা ছোট জলাভূমিও বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।নিজের উদ্যোগে গড়ে তোলা উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। জাতীয় পরিবেশ পদক আমাকে আরও দায়িত্বশীল করেছে।বিবিসিএফের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, আদনান আজাদ শুধু একজন বন্যপ্রাণী উদ্ধারকর্মী নন তিনি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের দীর্ঘদিনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী। বিবিসিএফ গড়ে ওঠার শুরুর দিকের সদস্য হিসেবে তার অবদানও উল্লেখযোগ্য।তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সংরক্ষণকর্মীদের এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে বিবিসিএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংরক্ষণে শুধু নীতি গ্রহণ করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।ড. এস এম ইকবাল বলেন, কোনো প্রাণী সংরক্ষণ করতে হলে প্রথমে মানুষের কাছে ওই প্রাণীর গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। মানুষের কাছে বন্যপ্রাণীর উপকারিতা স্পষ্ট না হলে শুধু আইন করে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন।আইইউসিএন বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলম দিপু বলেন, আদনান আজাদের দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পুরস্কার পাওয়ার অর্থ কাজ শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বরং দায়িত্ব আরও বেড়ে যাওয়া।তিনি পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই সংরক্ষণকর্মীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আতিকুর রহমান মিঠু বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য হ্রাসের চিত্র তুলে ধরে বলেন, গত ২০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০০ প্রজাতি হারিয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বড় সতর্কবার্তা।তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।কৃষিবিদ শহিদুর রহমান বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু বন বা অভয়ারণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বসতি ও কৃষিজমির সঙ্গেও বন্যপ্রাণীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় ও অপ্রচলিত ফলের গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি বাপ্পি খান বলেন, বন্যপ্রাণী ও প্রাণীকল্যাণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি পাওয়া জরুরি। আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর অর্জন তরুণদের সংরক্ষণকাজে উৎসাহিত করবে।অধ্যাপক টিপু সুলতানও দুই পুরস্কারপ্রাপ্তের কাজের প্রশংসা করেন। তিনি সংরক্ষণ আন্দোলনে ব্যক্তি উদ্যোগ ও সামাজিক সংগঠনের ভূমিকা বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আজকের আয়োজনকে আমি শুধু সংবর্ধনা হিসেবে দেখি না। আমরা আনন্দ ভাগাভাগি করতে একত্রিত হয়েছি। আদনান আজাদ ও হাসমত আলীর অর্জন আমাদের সবার অর্জন।’তিনি বলেন, বিবিসিএফের ৩১৪টির বেশি সংগঠনের ৩০ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছেন। জাতীয় পর্যায়ে দুই সংরক্ষণকর্মীর স্বীকৃতি এই বিশাল স্বেচ্ছাসেবী পরিবারের জন্যও আনন্দের বিষয়।আদনান আজাদের দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ড. নাছির উদ্দিন বলেন, এই অভিজ্ঞতা জাতীয় নীতিনির্ধারণে কাজে লাগানো যেতে পারে। বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নীতি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।আদনান আজাদকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্পৃক্ত করার জন্য বিবিসিএফের ৩১৪টি সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান ড. নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জাতীয় নীতিনির্ধারণে যুক্ত করা হলে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর হবে।অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় দুই জাতীয় পুরস্কারজয়ীকে বিবিসিএফের সংবর্ধনা