বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা শেরপুর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, নদী, সবুজ প্রকৃতি ও সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির পাশাপাশি শেরপুরের রয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি। এ জেলার খাবারের মধ্যে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, স্থানীয় মানুষের রুচি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রান্নার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। বিশেষ করে শেরপুরের মিষ্টি, পিঠা, দুধের তৈরি খাবার এবং স্থানীয় বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পদ ভোজনরসিকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।
চলুন, জেনে নেওয়া যাক শেরপুর জেলার বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী কিছু খাবার সম্পর্কে।
শেরপুরের মিষ্টিজাতীয় খাবারের মধ্যে ছানার পায়েস বেশ পরিচিত একটি নাম। দুধ থেকে তৈরি ছানা, চিনি ও সুগন্ধি উপকরণ দিয়ে এই মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। এর নরম গঠন এবং মিষ্টি স্বাদ খাবারপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। বিভিন্ন উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে এ ধরনের মিষ্টান্নের প্রচলন রয়েছে।
শেরপুরের গ্রামীণ জনপদে দুধের তৈরি নানা খাবারের প্রচলন রয়েছে। দুধ, ক্ষীর, ছানা, দই ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি মিষ্টির স্বাদ অনেকের কাছেই আলাদা আকর্ষণ বহন করে।
শীতকাল এলেই শেরপুরের গ্রামাঞ্চলে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। বাঙালির চিরায়ত পিঠার ঐতিহ্য এখানেও বেশ সমৃদ্ধ। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পিঠা হলো—
এসব পিঠা শুধু খাবার নয়, বরং শেরপুরের গ্রামীণ জীবন ও শীতকালীন উৎসবের আনন্দেরও একটি অংশ।
শীত মৌসুমে খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় গ্রামবাংলার অন্যতম আকর্ষণ। শেরপুরের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় খেজুরের গুড় দিয়ে পিঠা, পায়েস, মুড়ি ও নানা ধরনের মিষ্টি খাবার তৈরি করা হয়। বিশেষ করে শীতের সকালে গরম ভাপা পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড়ের স্বাদ সত্যিই অতুলনীয়।
শীতকাল কিংবা বিশেষ পারিবারিক আয়োজনে হাঁসের মাংসের প্রচলন গ্রামবাংলার একটি পরিচিত ঐতিহ্য। শেরপুরের অনেক পরিবারেও হাঁসের মাংসের সঙ্গে চালের রুটি বা ভাত পরিবেশন করা হয়। মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করা হাঁসের মাংসের স্বাদ ভোজনরসিকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
শেরপুরের নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের কারণে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসে দেশি মাছের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মাছ দিয়ে ঝোল, ভুনা, ভর্তা ও শাক-সবজি মিশিয়ে নানা পদ রান্না করা হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাবারে মাছ-ভাতের প্রচলন বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় ও পাহাড়সংলগ্ন অঞ্চলে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি রয়েছে। সেখানকার খাবারের মধ্যে বাঁশকোরল বা বাঁশের কচি অংশ দিয়ে তৈরি তরকারি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা এই খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ সাধারণ তরকারি থেকে কিছুটা আলাদা।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলার পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় গারোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তাঁদের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি শেরপুরের সামগ্রিক খাবারের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
এসব জনগোষ্ঠীর খাবারে স্থানীয় শাকসবজি, বাঁশকোরল, দেশি মাছ, মাংস এবং প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়। তাঁদের রান্নার পদ্ধতি ও খাবারের স্বাদ শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
শেরপুরের খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর গ্রামীণ স্বাদ ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। এখানকার মানুষের খাদ্যাভ্যাসে স্থানীয় কৃষিপণ্য, মৌসুমি শাকসবজি, দেশি মাছ, দুধ, গুড় এবং পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
এ ছাড়া শেরপুরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রান্নার ধরন এ জেলার খাবারকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়। একই জেলার সমতল ও পাহাড়ি এলাকার খাবারের মধ্যে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
শেরপুর জেলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্যই নয়, বরং নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্যের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। এখানকার পিঠা-পুলি, দুধের তৈরি মিষ্টি, দেশি মাছের পদ, হাঁসের মাংস এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার এ জেলার সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শেরপুরের খাবারের স্বাদ গ্রহণ মানে শুধু সুস্বাদু কিছু খাবার খাওয়া নয়, বরং এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। তাই শেরপুর ভ্রমণে গেলে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি এ জেলার বৈচিত্র্যময় খাদ্যঐতিহ্য সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করা উচিত।
Google
-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা শেরপুর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, নদী, সবুজ প্রকৃতি ও সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতির পাশাপাশি শেরপুরের রয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি। এ জেলার খাবারের মধ্যে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, স্থানীয় মানুষের রুচি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা রান্নার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। বিশেষ করে শেরপুরের মিষ্টি, পিঠা, দুধের তৈরি খাবার এবং স্থানীয় বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পদ ভোজনরসিকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।
চলুন, জেনে নেওয়া যাক শেরপুর জেলার বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী কিছু খাবার সম্পর্কে।
শেরপুরের মিষ্টিজাতীয় খাবারের মধ্যে ছানার পায়েস বেশ পরিচিত একটি নাম। দুধ থেকে তৈরি ছানা, চিনি ও সুগন্ধি উপকরণ দিয়ে এই মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। এর নরম গঠন এবং মিষ্টি স্বাদ খাবারপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। বিভিন্ন উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে এ ধরনের মিষ্টান্নের প্রচলন রয়েছে।
শেরপুরের গ্রামীণ জনপদে দুধের তৈরি নানা খাবারের প্রচলন রয়েছে। দুধ, ক্ষীর, ছানা, দই ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি মিষ্টির স্বাদ অনেকের কাছেই আলাদা আকর্ষণ বহন করে।
শীতকাল এলেই শেরপুরের গ্রামাঞ্চলে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। বাঙালির চিরায়ত পিঠার ঐতিহ্য এখানেও বেশ সমৃদ্ধ। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পিঠা হলো—
এসব পিঠা শুধু খাবার নয়, বরং শেরপুরের গ্রামীণ জীবন ও শীতকালীন উৎসবের আনন্দেরও একটি অংশ।
শীত মৌসুমে খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় গ্রামবাংলার অন্যতম আকর্ষণ। শেরপুরের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় খেজুরের গুড় দিয়ে পিঠা, পায়েস, মুড়ি ও নানা ধরনের মিষ্টি খাবার তৈরি করা হয়। বিশেষ করে শীতের সকালে গরম ভাপা পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড়ের স্বাদ সত্যিই অতুলনীয়।
শীতকাল কিংবা বিশেষ পারিবারিক আয়োজনে হাঁসের মাংসের প্রচলন গ্রামবাংলার একটি পরিচিত ঐতিহ্য। শেরপুরের অনেক পরিবারেও হাঁসের মাংসের সঙ্গে চালের রুটি বা ভাত পরিবেশন করা হয়। মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করা হাঁসের মাংসের স্বাদ ভোজনরসিকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
শেরপুরের নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের কারণে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসে দেশি মাছের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মাছ দিয়ে ঝোল, ভুনা, ভর্তা ও শাক-সবজি মিশিয়ে নানা পদ রান্না করা হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাবারে মাছ-ভাতের প্রচলন বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় ও পাহাড়সংলগ্ন অঞ্চলে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি রয়েছে। সেখানকার খাবারের মধ্যে বাঁশকোরল বা বাঁশের কচি অংশ দিয়ে তৈরি তরকারি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা এই খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ সাধারণ তরকারি থেকে কিছুটা আলাদা।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলার পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় গারোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তাঁদের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি শেরপুরের সামগ্রিক খাবারের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
এসব জনগোষ্ঠীর খাবারে স্থানীয় শাকসবজি, বাঁশকোরল, দেশি মাছ, মাংস এবং প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়। তাঁদের রান্নার পদ্ধতি ও খাবারের স্বাদ শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
শেরপুরের খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর গ্রামীণ স্বাদ ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। এখানকার মানুষের খাদ্যাভ্যাসে স্থানীয় কৃষিপণ্য, মৌসুমি শাকসবজি, দেশি মাছ, দুধ, গুড় এবং পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
এ ছাড়া শেরপুরের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রান্নার ধরন এ জেলার খাবারকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়। একই জেলার সমতল ও পাহাড়ি এলাকার খাবারের মধ্যে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
শেরপুর জেলা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্যই নয়, বরং নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্যের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। এখানকার পিঠা-পুলি, দুধের তৈরি মিষ্টি, দেশি মাছের পদ, হাঁসের মাংস এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার এ জেলার সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শেরপুরের খাবারের স্বাদ গ্রহণ মানে শুধু সুস্বাদু কিছু খাবার খাওয়া নয়, বরং এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। তাই শেরপুর ভ্রমণে গেলে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি এ জেলার বৈচিত্র্যময় খাদ্যঐতিহ্য সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করা উচিত।

আপনার মতামত লিখুন