বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদগুলোর মধ্যে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী জেলা বগুড়া কেবল ঐতিহাসিক নিদর্শন বা প্রত্নতাত্ত্বিক সমৃদ্ধির জন্যই পরিচিত নয়, এর রন্ধনশৈলীও সমানভাবে আকর্ষণীয়। শত শত বছরের ইতিহাস, ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আগমন এবং স্থানীয়দের সৃষ্টিশীলতায় বগুড়ার খাবার সংস্কৃতিতে যোগ হয়েছে দারুণ বৈচিত্র্য। মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে শুরু করে শেরপুরের ঐতিহ্য—বগুড়ার অনেক পদ আজ দেশ পেরিয়ে বিদেশেও নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
আসুন, এক নজরে জেনে নেওয়া যাক বগুড়ার এমন কিছু ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় খাবার সম্পর্কে, যা ভ্রমণপিপাসু ও খাদ্য রসিকদের মন জয় করে চলেছে যুগের পর যুগ।
বগুড়ার ব্র্যান্ডিংয়ের কথা বললেই সবার আগে মাথায় আসে ‘বগুড়ার দই’-এর নাম। প্রায় আড়াইশ বছর আগে শেরপুর উপজেলায় প্রথম এই টক দই তৈরির প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীতে এর সাথে চিনির সংমিশ্রণে মিষ্টি দইয়ের পথচলা শুরু হয়। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল ও স্বাধীনতার আগের সোনালী সময়ে এই দইয়ের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। খাঁটি দুধের সর, নিখুঁত কারিগরি এবং মাটির হাঁড়ির জাদুকরী ছোঁয়ায় তৈরি এই দইয়ের স্বাদ আজ শুধু দেশেই নয়, পৌঁছে গেছে প্রবাসীদের ডাইনিং টেবিলেও।
বগুড়ার প্রধান আকর্ষণ মহাস্থানগড় এলাকায় গেলে যে খাবারটি আপনার নজর কাড়বে তা হলো ‘চালের কটকটি’। সুগন্ধি চালের আটা, তেল এবং গুড়ের সুনিপুণ কারসাজিতে তৈরি এই খাবারটি খেতে যেমন মুচমুচে, তেমনি সুস্বাদু। মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব দোকানে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই কটকটির প্যাকেট ছাড়া মহাস্থানগড় ভ্রমণ যেন অপূর্ণই থেকে যায়।
বগুড়ার মিষ্টান্ন ভাণ্ডারগুলোর খ্যাতি দেশজুড়ে। এর মধ্যে রসগোল্লার একটু ভিন্ন ও অভিজাত রূপ হলো ‘স্পঞ্জ মিষ্টি’। একদম তুলতুলে নরম এবং রসে ভরপুর এই মিষ্টি মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। ছানা দিয়ে তৈরি এই স্পঞ্জের বিশেষ টেক্সচার সাধারণ রসগোল্লা থেকে একে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে। বগুড়ায় গেলে এই মিষ্টির স্বাদ নেওয়া আবশ্যক।
আলুপ্রেমীদের জন্য বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী ‘আলু ঘাটি’ এক পরম প্রাপ্তি। বাড়িতে যখন ভারী কোনো তরকারি থাকে না, তখন কেবল আলু আর ছোট মাছ বা মাংসের সংমিশ্রণে বিশেষ এই পদটি তৈরি করা হয়। সেদ্ধ আলু ভর্তার মতো চটকে, মশলা কষিয়ে মাছের সাথে মাখোমাখো করে রান্না করা এই পদটি দিয়ে অনায়াসেই দুই-তিন প্লেট ভাত খেয়ে ফেলা যায়।
ঈদ মানেই যেন বগুড়ার হাতে ভাজা লাচ্ছা সেমাই। ময়দাকে বিশেষ কৌশলে হাতের সাহায্যে ডালডার মিশ্রণে ডলায়িত করে তেল ও ঘিয়ে ভেজে এই সুস্বাদু সেমাই তৈরি করা হয়। বগুড়ার এই সেমাই তৈরির ঐতিহ্য শত বছরের পুরোনো। বর্তমানে এখানে শতাধিক ছোট-বড় কারখানা রয়েছে, যেখান থেকে উৎপাদিত সেমাই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
বগুড়ার স্থানীয় লোকজনের অত্যন্ত প্রিয় একটি খাবার হলো ‘পুরপুরি’। এটি মূলত ছোট মাছের একটি বিশেষ চচ্চরি। ছোট মাছের সাথে আলু, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও মশলা একসাথে কড়াইতে দিয়ে একদম হালকা পানি দিয়ে ঢেকে রান্না করা হয়। পানি শুকিয়ে যখন তেল ওপরে ভেসে ওঠে এবং কড়াইয়ের তলায় একটু পোড়া পোড়া ভাব আসে, তখন এটি নামানো হয়। গরম ভাতের সাথে এই অথেনটিক ‘পুরপুরি’ খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা।
বগুড়ার রান্নাঘরে আলুর বৈচিত্র্যময় ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো। এর মধ্যে ‘আলুর বাটাম’ বেশ স্পেশাল। আলু গোল গোল বা চাক চাক করে কেটে সামান্য তেল ও বিভিন্ন মশলায় একদম ভাজা ভাজা করে এটি রান্না করা হয়। গরম ভাত, রুটি, পরোটা কিংবা লুচির সাথে এই পদটি দারুণ মানিয়ে যায়।
নামে ডাল হলেও এতে কোনো ডালের অস্তিত্ব নেই! মুসুর ডালের পাতলা ঝোলের মতো করেই এটি রান্না করা হয়, তবে মূল উপকরণ হলো আলু। আলু, পানি, হলুদ ও লবণ দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে ভালোভাবে সেদ্ধ করে ঘুটে পানির সাথে মিশিয়ে ফেলা হয়। এরপর পেঁয়াজ ও রসুনের ফোড়ন দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু ‘আলুর ডাল’। এর সাথে এক-দুটি টমেটো ফালি যোগ করলে স্বাদে ভিন্ন মাত্রা আসে।
বগুড়ার কৃষিজমিতে উৎপাদিত লাল মরিচ দেশজুড়ে সমাদৃত। এখানকার আবহাওয়া ও অনুকূল পরিবেশ মরিচ চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। এই মরিচের বিশেষত্ব হলো এর আকর্ষণীয় টকটকে লাল রঙ এবং মাঝারি ঝাঁঝ, যা তরকারির স্বাদ ও সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় দ্বিগুণ। স্থানীয় ভাষায় এই অঞ্চলের মানুষ লাল মরিচকে ‘পত্ত্যে’ বলে থাকেন।
বগুড়ার আরও কিছু বিখ্যাত পদের ঝলক:
ক্ষির
আঠা আলু
শিক কাবাব
মুরগি ও গরুর চাপ
মাগুর পোলাও
মাছ মিষ্টি ইত্যাদি
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা বগুড়ার এই খাবারগুলো কেবল পেটেই নয়, মনকেও তৃপ্তি দেবে। পরবর্তী সময়ে উত্তরবঙ্গে ভ্রমণ করলে এই চমৎকার স্বাদের পদগুলোর কোনোটিই মিস করবেন না!
Google
-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদগুলোর মধ্যে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী জেলা বগুড়া কেবল ঐতিহাসিক নিদর্শন বা প্রত্নতাত্ত্বিক সমৃদ্ধির জন্যই পরিচিত নয়, এর রন্ধনশৈলীও সমানভাবে আকর্ষণীয়। শত শত বছরের ইতিহাস, ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আগমন এবং স্থানীয়দের সৃষ্টিশীলতায় বগুড়ার খাবার সংস্কৃতিতে যোগ হয়েছে দারুণ বৈচিত্র্য। মহাস্থানগড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে শুরু করে শেরপুরের ঐতিহ্য—বগুড়ার অনেক পদ আজ দেশ পেরিয়ে বিদেশেও নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
আসুন, এক নজরে জেনে নেওয়া যাক বগুড়ার এমন কিছু ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় খাবার সম্পর্কে, যা ভ্রমণপিপাসু ও খাদ্য রসিকদের মন জয় করে চলেছে যুগের পর যুগ।
বগুড়ার ব্র্যান্ডিংয়ের কথা বললেই সবার আগে মাথায় আসে ‘বগুড়ার দই’-এর নাম। প্রায় আড়াইশ বছর আগে শেরপুর উপজেলায় প্রথম এই টক দই তৈরির প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীতে এর সাথে চিনির সংমিশ্রণে মিষ্টি দইয়ের পথচলা শুরু হয়। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমল ও স্বাধীনতার আগের সোনালী সময়ে এই দইয়ের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। খাঁটি দুধের সর, নিখুঁত কারিগরি এবং মাটির হাঁড়ির জাদুকরী ছোঁয়ায় তৈরি এই দইয়ের স্বাদ আজ শুধু দেশেই নয়, পৌঁছে গেছে প্রবাসীদের ডাইনিং টেবিলেও।
বগুড়ার প্রধান আকর্ষণ মহাস্থানগড় এলাকায় গেলে যে খাবারটি আপনার নজর কাড়বে তা হলো ‘চালের কটকটি’। সুগন্ধি চালের আটা, তেল এবং গুড়ের সুনিপুণ কারসাজিতে তৈরি এই খাবারটি খেতে যেমন মুচমুচে, তেমনি সুস্বাদু। মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এসব দোকানে শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই কটকটির প্যাকেট ছাড়া মহাস্থানগড় ভ্রমণ যেন অপূর্ণই থেকে যায়।
বগুড়ার মিষ্টান্ন ভাণ্ডারগুলোর খ্যাতি দেশজুড়ে। এর মধ্যে রসগোল্লার একটু ভিন্ন ও অভিজাত রূপ হলো ‘স্পঞ্জ মিষ্টি’। একদম তুলতুলে নরম এবং রসে ভরপুর এই মিষ্টি মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। ছানা দিয়ে তৈরি এই স্পঞ্জের বিশেষ টেক্সচার সাধারণ রসগোল্লা থেকে একে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে। বগুড়ায় গেলে এই মিষ্টির স্বাদ নেওয়া আবশ্যক।
আলুপ্রেমীদের জন্য বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী ‘আলু ঘাটি’ এক পরম প্রাপ্তি। বাড়িতে যখন ভারী কোনো তরকারি থাকে না, তখন কেবল আলু আর ছোট মাছ বা মাংসের সংমিশ্রণে বিশেষ এই পদটি তৈরি করা হয়। সেদ্ধ আলু ভর্তার মতো চটকে, মশলা কষিয়ে মাছের সাথে মাখোমাখো করে রান্না করা এই পদটি দিয়ে অনায়াসেই দুই-তিন প্লেট ভাত খেয়ে ফেলা যায়।
ঈদ মানেই যেন বগুড়ার হাতে ভাজা লাচ্ছা সেমাই। ময়দাকে বিশেষ কৌশলে হাতের সাহায্যে ডালডার মিশ্রণে ডলায়িত করে তেল ও ঘিয়ে ভেজে এই সুস্বাদু সেমাই তৈরি করা হয়। বগুড়ার এই সেমাই তৈরির ঐতিহ্য শত বছরের পুরোনো। বর্তমানে এখানে শতাধিক ছোট-বড় কারখানা রয়েছে, যেখান থেকে উৎপাদিত সেমাই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
বগুড়ার স্থানীয় লোকজনের অত্যন্ত প্রিয় একটি খাবার হলো ‘পুরপুরি’। এটি মূলত ছোট মাছের একটি বিশেষ চচ্চরি। ছোট মাছের সাথে আলু, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও মশলা একসাথে কড়াইতে দিয়ে একদম হালকা পানি দিয়ে ঢেকে রান্না করা হয়। পানি শুকিয়ে যখন তেল ওপরে ভেসে ওঠে এবং কড়াইয়ের তলায় একটু পোড়া পোড়া ভাব আসে, তখন এটি নামানো হয়। গরম ভাতের সাথে এই অথেনটিক ‘পুরপুরি’ খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা।
বগুড়ার রান্নাঘরে আলুর বৈচিত্র্যময় ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো। এর মধ্যে ‘আলুর বাটাম’ বেশ স্পেশাল। আলু গোল গোল বা চাক চাক করে কেটে সামান্য তেল ও বিভিন্ন মশলায় একদম ভাজা ভাজা করে এটি রান্না করা হয়। গরম ভাত, রুটি, পরোটা কিংবা লুচির সাথে এই পদটি দারুণ মানিয়ে যায়।
নামে ডাল হলেও এতে কোনো ডালের অস্তিত্ব নেই! মুসুর ডালের পাতলা ঝোলের মতো করেই এটি রান্না করা হয়, তবে মূল উপকরণ হলো আলু। আলু, পানি, হলুদ ও লবণ দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে ভালোভাবে সেদ্ধ করে ঘুটে পানির সাথে মিশিয়ে ফেলা হয়। এরপর পেঁয়াজ ও রসুনের ফোড়ন দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু ‘আলুর ডাল’। এর সাথে এক-দুটি টমেটো ফালি যোগ করলে স্বাদে ভিন্ন মাত্রা আসে।
বগুড়ার কৃষিজমিতে উৎপাদিত লাল মরিচ দেশজুড়ে সমাদৃত। এখানকার আবহাওয়া ও অনুকূল পরিবেশ মরিচ চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। এই মরিচের বিশেষত্ব হলো এর আকর্ষণীয় টকটকে লাল রঙ এবং মাঝারি ঝাঁঝ, যা তরকারির স্বাদ ও সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় দ্বিগুণ। স্থানীয় ভাষায় এই অঞ্চলের মানুষ লাল মরিচকে ‘পত্ত্যে’ বলে থাকেন।
বগুড়ার আরও কিছু বিখ্যাত পদের ঝলক:
ক্ষির
আঠা আলু
শিক কাবাব
মুরগি ও গরুর চাপ
মাগুর পোলাও
মাছ মিষ্টি ইত্যাদি
ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা বগুড়ার এই খাবারগুলো কেবল পেটেই নয়, মনকেও তৃপ্তি দেবে। পরবর্তী সময়ে উত্তরবঙ্গে ভ্রমণ করলে এই চমৎকার স্বাদের পদগুলোর কোনোটিই মিস করবেন না!

আপনার মতামত লিখুন