মুন টাইমস নিউজ

রাজনীতি

৭ নভেম্বরের চেতনা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রেরণা: বিএনপি

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ফটো কার্ড
৭ নভেম্বরের চেতনা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রেরণা: বিএনপি

জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহত করা, গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন এবং মানুষের কথা বলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন।

রিজভী বলেন, পরবর্তী সময়ে যখনই দেশে একদলীয় বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে, তখনই ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জনগণ রাজপথে নেমেছে। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও সেই চেতনার প্রতিফলন দেখা গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দলের কর্মসূচি ও দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

রিজভী বলেন, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কয়েক মিনিটের মধ্যে বহুদলীয় গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলো বন্ধ করে দিয়ে একটি মাত্র রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় রাখা হয়েছিল। এরপর একে একে মানুষের কথা বলা, লেখালেখি, মতপ্রকাশ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়।

তার অভিযোগ, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা দেশের স্বাধীনতাকেও অরক্ষিত ও বিপন্ন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি বিদেশি দেশের অনুসারী হয়ে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা লাভ করে এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী হয়। এ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। তিনি একে একে বন্ধ দরজা খুলে দিয়ে গণতন্ত্রের অবাধ চর্চা, কথা বলার স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেন।

৭ নভেম্বরের চেতনায় গণ-অভ্যুত্থান

৭ নভেম্বরের চেতনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে রিজভী বলেন, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন কায়দায় বাকশাল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলেও তা পরাজিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও ৭ নভেম্বরের চেতনা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে তাঁর দাবি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে গণতন্ত্র। এ দেশের মানুষ প্রাণ খুলে কথা বলতে চায় এবং নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে চায়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী রাখার আকাঙ্ক্ষাও মানুষের মধ্যে সব সময় রয়েছে। ৭ নভেম্বরের চেতনা সেই আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করে।

৭ নভেম্বর উপলক্ষে ঢাকায় বিএনপির শোভাযাত্রা

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির সাত দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল ৭ নভেম্বর রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনী বক্তব্যের পর শোভাযাত্রা শুরু হবে।

শোভাযাত্রাটি নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের কাছে গিয়ে ডান দিকে মোড় নেবে। এরপর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দিয়ে বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হবে।

এর আগে সকাল সাড়ে আটটায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কবরে ফাতেহা পাঠ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

রিজভী জানান, ৫ নভেম্বর থেকে সাত দিনের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। আগামীকাল দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগরে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন আলোচনা সভা, পোস্টার লাগানোসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে। ৭ নভেম্বরের চেতনায় বিশ্বাসী অন্য রাজনৈতিক দল, জোট, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সংগঠনও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের কর্মসূচি নিয়েছে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ৭ নভেম্বরের চেতনার প্রতি ভীত হয়ে দিবসটির রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন বন্ধ করেছিল। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এত দিন দিবসটি পালন করে আসছে। এবার দীর্ঘদিন পর আবারও রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে বলে তিনি জানান।

রিজভীর ভাষ্য, ৭ নভেম্বরের চেতনা শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ ও আবেদন তৈরি করেছে। এই চেতনার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের ধারাও বিকশিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ

সম্প্রতি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির এই নেতা। ৭ নভেম্বরের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে কোনো সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনগণ ও সরকার এ বিষয়ে প্রস্তুত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের বাহিনীগুলো যথাযথভাবে পালন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

রিজভীর অভিযোগ, পলাতক আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্নভাবে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি থাকতে পারে এবং সেসব দাবি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দাবি মেনে নেওয়ার পরও কারখানা ভাঙচুর, পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া, গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং একজন শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলনের সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন রিজভী। তিনি বলেন, ২০১১ বা ২০১২ সালে শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কয়েক দিন পর নদীর ধারে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরব হয়েছিল। ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রিজভী প্রশ্ন তোলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরি করে পরাজিত শক্তি ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটাতে চায় কি না। বিরোধী মত দমনে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তার দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনায় উসকানিদাতাদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা। কোন কারখানার মালিকেরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত, সেটিও ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, এসব কারখানার অধিকাংশ মালিক আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। হঠাৎ কারখানা ছুটি দিয়ে শ্রমিকদের উসকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।

রিজভী বলেন, দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর জনগণের ভোটে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সেই সরকারকে বিচলিত করতে এবং দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেও উসকানি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী ১৭ বছর ধরে দেশের ব্যাংক, আর্থিক খাত ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুট করেছেন, তাঁদের অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। আবার কেউ কেউ দেশে থেকে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছেন।

শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিরোধ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি পোশাকশিল্পে সম্ভাব্য অস্থিরতা নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন সূত্রে আরও বেশি তথ্য পৌঁছায়। তার আশঙ্কার কিছু প্রতিফলন সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন এক বিষয়। কিন্তু কারখানা ভাঙচুর, গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং পুলিশ বক্সে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এসব কারা করছে, তা সবার কাছে স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শ্রমিকদের সংকট নিরসনে সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছে এবং সংকটের সমাধান হয়েছে বলে দাবি করেন রিজভী। তাঁর বক্তব্য, শ্রমিক নেতারাও বলেছেন, সংকট মোকাবিলা করা হচ্ছে। ফলে এখন যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলোকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।

পোশাকশিল্পের শ্রমিক আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার আলাদা করে কিছু বলার নেই। তবে এসব ঘটনা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গুপ্ত রাজনীতির সম্পর্কের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশে রিজভী বলেন, আগুনে ঘি ঢেলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে ধোঁয়াশার মধ্যে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। এ ধরনের উসকানিতে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তার আঁচ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর গায়েও লাগতে পারে।

তিনি বলেন, সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। জনগণও যেকোনো অরাজকতা প্রতিহত করতে প্রস্তুত।

Google Google -এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

আপনার মতামত লিখুন

মুন টাইমস নিউজ

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬


৭ নভেম্বরের চেতনা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রেরণা: বিএনপি

প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুসংহত করা, গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন এবং মানুষের কথা বলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন।

রিজভী বলেন, পরবর্তী সময়ে যখনই দেশে একদলীয় বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনের মাধ্যমে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে, তখনই ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জনগণ রাজপথে নেমেছে। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও সেই চেতনার প্রতিফলন দেখা গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দলের কর্মসূচি ও দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

রিজভী বলেন, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কয়েক মিনিটের মধ্যে বহুদলীয় গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলো বন্ধ করে দিয়ে একটি মাত্র রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় রাখা হয়েছিল। এরপর একে একে মানুষের কথা বলা, লেখালেখি, মতপ্রকাশ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়।

তার অভিযোগ, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা দেশের স্বাধীনতাকেও অরক্ষিত ও বিপন্ন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি বিদেশি দেশের অনুসারী হয়ে পড়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের মধ্য দিয়ে দেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীনতা লাভ করে এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী হয়। এ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। তিনি একে একে বন্ধ দরজা খুলে দিয়ে গণতন্ত্রের অবাধ চর্চা, কথা বলার স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করেন।

৭ নভেম্বরের চেতনায় গণ-অভ্যুত্থান

৭ নভেম্বরের চেতনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে রিজভী বলেন, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন কায়দায় বাকশাল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলেও তা পরাজিত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও ৭ নভেম্বরের চেতনা মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে তাঁর দাবি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে গণতন্ত্র। এ দেশের মানুষ প্রাণ খুলে কথা বলতে চায় এবং নির্ভয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে চায়। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী রাখার আকাঙ্ক্ষাও মানুষের মধ্যে সব সময় রয়েছে। ৭ নভেম্বরের চেতনা সেই আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করে।

৭ নভেম্বর উপলক্ষে ঢাকায় বিএনপির শোভাযাত্রা

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির সাত দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল ৭ নভেম্বর রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনী বক্তব্যের পর শোভাযাত্রা শুরু হবে।

শোভাযাত্রাটি নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের কাছে গিয়ে ডান দিকে মোড় নেবে। এরপর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দিয়ে বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হবে।

এর আগে সকাল সাড়ে আটটায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কবরে ফাতেহা পাঠ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

রিজভী জানান, ৫ নভেম্বর থেকে সাত দিনের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। আগামীকাল দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগরে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন আলোচনা সভা, পোস্টার লাগানোসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে। ৭ নভেম্বরের চেতনায় বিশ্বাসী অন্য রাজনৈতিক দল, জোট, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সংগঠনও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের কর্মসূচি নিয়েছে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ৭ নভেম্বরের চেতনার প্রতি ভীত হয়ে দিবসটির রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন বন্ধ করেছিল। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এত দিন দিবসটি পালন করে আসছে। এবার দীর্ঘদিন পর আবারও রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে বলে তিনি জানান।

রিজভীর ভাষ্য, ৭ নভেম্বরের চেতনা শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যেই নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ ও আবেদন তৈরি করেছে। এই চেতনার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের ধারাও বিকশিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ

সম্প্রতি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির এই নেতা। ৭ নভেম্বরের শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে কোনো সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জনগণ ও সরকার এ বিষয়ে প্রস্তুত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের বাহিনীগুলো যথাযথভাবে পালন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

রিজভীর অভিযোগ, পলাতক আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা বিভিন্নভাবে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি থাকতে পারে এবং সেসব দাবি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দাবি মেনে নেওয়ার পরও কারখানা ভাঙচুর, পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া, গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং একজন শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলনের সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন রিজভী। তিনি বলেন, ২০১১ বা ২০১২ সালে শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কয়েক দিন পর নদীর ধারে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরব হয়েছিল। ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রিজভী প্রশ্ন তোলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরি করে পরাজিত শক্তি ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটাতে চায় কি না। বিরোধী মত দমনে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

তার দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনায় উসকানিদাতাদের অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা। কোন কারখানার মালিকেরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত, সেটিও ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, এসব কারখানার অধিকাংশ মালিক আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। হঠাৎ কারখানা ছুটি দিয়ে শ্রমিকদের উসকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।

রিজভী বলেন, দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর জনগণের ভোটে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সেই সরকারকে বিচলিত করতে এবং দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেও উসকানি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী ১৭ বছর ধরে দেশের ব্যাংক, আর্থিক খাত ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুট করেছেন, তাঁদের অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। আবার কেউ কেউ দেশে থেকে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছেন।

শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিরোধ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি পোশাকশিল্পে সম্ভাব্য অস্থিরতা নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন সূত্রে আরও বেশি তথ্য পৌঁছায়। তার আশঙ্কার কিছু প্রতিফলন সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন এক বিষয়। কিন্তু কারখানা ভাঙচুর, গাড়িতে আগুন দেওয়া এবং পুলিশ বক্সে পেট্রল ঢেলে আগুন দেওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এসব কারা করছে, তা সবার কাছে স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শ্রমিকদের সংকট নিরসনে সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছে এবং সংকটের সমাধান হয়েছে বলে দাবি করেন রিজভী। তাঁর বক্তব্য, শ্রমিক নেতারাও বলেছেন, সংকট মোকাবিলা করা হচ্ছে। ফলে এখন যেসব ঘটনা ঘটছে, সেগুলোকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।

পোশাকশিল্পের শ্রমিক আন্দোলনে বিরোধী দলগুলোর সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার আলাদা করে কিছু বলার নেই। তবে এসব ঘটনা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গুপ্ত রাজনীতির সম্পর্কের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশে রিজভী বলেন, আগুনে ঘি ঢেলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে ধোঁয়াশার মধ্যে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। এ ধরনের উসকানিতে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তার আঁচ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর গায়েও লাগতে পারে।

তিনি বলেন, সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। জনগণও যেকোনো অরাজকতা প্রতিহত করতে প্রস্তুত।


মুন টাইমস নিউজ

সম্পাদক: তাবিবুর রহমান তালুকদার
প্রকাশক: জিন্নাহ ফারুক
আইন উপদেষ্টা: এ্যাডঃ মোঃ মাহবুব আলম সরকার

© ২০২৬ মুন টাইমস নিউজ