মুন টাইমস নিউজ

বিখ্যাত খাবার

রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত খাবার

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ফটো কার্ড
রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত খাবার

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জেলা রাঙ্গামাটি। পাহাড়, লেক, ঝরনা ও সবুজ প্রকৃতির জন্য পরিচিত এই জেলার রয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী রান্না, বাঁশের ভেতরে রান্না করা খাবার, পাহাড়ি মাছ, শুঁটকি এবং বিভিন্ন ধরনের দেশীয় খাবার রাঙ্গামাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

রাঙ্গামাটির খাবারের বিশেষত্ব হলো এর প্রাকৃতিক উপকরণ ও রান্নার নিজস্ব পদ্ধতি। পাহাড়ে উৎপাদিত বিভিন্ন শাকসবজি, বাঁশকোরল, দেশীয় মসলা, মাছ ও মাংস দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার। চাকমা, মারমা ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতির সমন্বয়ে এ জেলার খাবারে তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য।

এ জেলার খাবারের স্বাদে মিশে আছে পাহাড়ি জীবনযাত্রা, প্রকৃতি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।

চলুন জেনে নেওয়া যাক রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কিছু খাবার সম্পর্কে।

১. বাঁশের চিকন

রাঙ্গামাটির অন্যতম পরিচিত পাহাড়ি খাবার হলো বাঁশের চিকন। স্থানীয়ভাবে বাঁশের ভেতরে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে রান্না করা খাবার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতির বিশেষ অংশ।

বাঁশের ভেতরে চাল, মাছ, মাংস কিংবা বিভিন্ন মসলা দিয়ে রান্না করা হয়। রান্নার সময় বাঁশের নিজস্ব ঘ্রাণ খাবারের মধ্যে মিশে যায়, যা স্বাদে ভিন্নতা তৈরি করে।

প্রাকৃতিক উপকরণ ও ঐতিহ্যবাহী রান্নার পদ্ধতির কারণে এই খাবার পর্যটকদের কাছেও বেশ আকর্ষণীয়।

২. বাঁশকোরলের তরকারি

রাঙ্গামাটির পাহাড়ি খাবারের তালিকায় বাঁশকোরলের বিশেষ স্থান রয়েছে। বাঁশের কচি অংশকে বাঁশকোরল বলা হয়। পাহাড়ি এলাকায় এটি একটি পরিচিত খাদ্য উপকরণ।

বাঁশকোরল দিয়ে মাছ, মাংস কিংবা বিভিন্ন সবজির সঙ্গে তরকারি রান্না করা হয়। স্থানীয় মসলা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি এই খাবারের স্বাদ অন্যরকম।

বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রান্নায় বাঁশকোরলের ব্যবহার বেশ প্রচলিত।

৩. পাহাড়ি মাছের নানা পদ

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ ও আশপাশের জলাশয়ে বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যায়। এ কারণে মাছ এখানকার মানুষের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রুই, কাতলা, কাচকি, চাপিলা, টাকি ও অন্যান্য স্থানীয় মাছ দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের খাবার।

মাছ ভাজা, মাছের ঝোল, সরিষা দিয়ে মাছ রান্না এবং দেশীয় মসলায় তৈরি মাছের তরকারি স্থানীয় মানুষের কাছে জনপ্রিয়।

বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদের মাছ রাঙ্গামাটির খাদ্যসংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৪. পাহাড়ি শুঁটকি

রাঙ্গামাটির পাহাড়ি খাবারের মধ্যে শুঁটকিরও বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মাছ শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুঁটকি।

শুঁটকি দিয়ে ভর্তা, ঝোল ও বিভিন্ন ধরনের তরকারি রান্না করা হয়। পেঁয়াজ, রসুন, শুকনো মরিচ ও দেশীয় মসলা দিয়ে তৈরি শুঁটকির খাবার বেশ সুস্বাদু।

গরম ভাতের সঙ্গে শুঁটকি ভর্তা পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় খাদ্যসংস্কৃতিতেই পরিচিত একটি খাবার।

৫. চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার

রাঙ্গামাটিতে বসবাসকারী চাকমা জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি। তাদের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় পাহাড়ে উৎপাদিত শাকসবজি, মাছ, মাংস ও প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়।

চাকমাদের পরিচিত খাবারের মধ্যে রয়েছে:

  • পাজন
  • হরবাং
  • বাঁশকোরলের তরকারি
  • বিভিন্ন ধরনের শাক ও সবজির পদ
  • মাছ ও মাংসের দেশীয় রান্না

বিশেষ করে পাজন চাকমা জনগোষ্ঠীর একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও দেশীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি এই খাবার উৎসব ও বিশেষ আয়োজনে পরিবেশন করা হয়।

৬. পাজন

রাঙ্গামাটির চাকমা জনগোষ্ঠীর অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো পাজন। এটি বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও পাহাড়ি সবজি দিয়ে তৈরি করা হয়।

পাজন রান্নায় মৌসুমি শাকসবজি, বাঁশকোরলসহ বিভিন্ন স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়। অঞ্চল ও পরিবারের রন্ধনপ্রণালি অনুযায়ী এর উপকরণ ও স্বাদে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।

বিশেষ করে বিজু উৎসবের সময় পাজন রান্নার প্রচলন রয়েছে। এটি শুধু একটি খাবার নয়, বরং চাকমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৭. মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার

রাঙ্গামাটির মারমা জনগোষ্ঠীরও রয়েছে স্বতন্ত্র খাদ্যসংস্কৃতি। তাদের খাবারে মাছ, মাংস, শাকসবজি, বাঁশকোরল ও বিভিন্ন ধরনের দেশীয় উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়।

মারমাদের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় সাধারণত প্রাকৃতিক উপকরণ ও নিজস্ব মসলার ব্যবহার বেশি গুরুত্ব পায়।

বিভিন্ন উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজনে এসব খাবার পরিবেশন করা হয়। পাহাড়ি খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরতে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের গুরুত্ব রয়েছে।

৮. পাহাড়ি শাকসবজির নানা পদ

রাঙ্গামাটির পাহাড়ে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও প্রাকৃতিক খাদ্য উপকরণ পাওয়া যায়। এসব উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার।

পাহাড়ি শাক, কচুশাক, বিভিন্ন বুনো সবজি, বাঁশকোরল ও মৌসুমি সবজি দিয়ে রান্না করা হয় তরকারি ও ভর্তা।

স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় এসব শাকসবজির গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি এসব খাবার রাঙ্গামাটির খাদ্যসংস্কৃতিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

৯. পাহাড়ি মুরগি ও মাংসের নানা পদ

রাঙ্গামাটির গ্রামীণ ও পাহাড়ি খাদ্যসংস্কৃতিতে মুরগি ও বিভিন্ন ধরনের মাংসের খাবারের প্রচলন রয়েছে।

দেশীয় মসলা, পাহাড়ি শাকসবজি, আদা, রসুন ও কাঁচামরিচ দিয়ে মাংস রান্না করা হয়। কোনো কোনো ঐতিহ্যবাহী রান্নায় বাঁশের ভেতরেও মাংস রান্না করা হয়।

বিশেষ করে সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও অতিথি আপ্যায়নে এসব খাবারের আয়োজন দেখা যায়।

১০. পাহাড়ি ফল ও মৌসুমি ফলের খাবার

রাঙ্গামাটির পাহাড়ি অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল উৎপাদিত হয়। আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেঁপে ও বিভিন্ন পাহাড়ি ফল স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

এসব ফল সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি জুস, শরবত ও বিভিন্ন ধরনের ঘরোয়া খাবার তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।

বিশেষ করে পাহাড়ি আনারস ও অন্যান্য মৌসুমি ফল পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।

রাঙ্গামাটি জেলার খাবারের বিশেষত্ব

রাঙ্গামাটির খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি। চাকমা, মারমা ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী রান্নার মাধ্যমে এ জেলার খাবারে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী স্বাদ ও বৈচিত্র্য।

বাঁশকোরল, পাহাড়ি শাকসবজি, কাপ্তাই হ্রদের মাছ, শুঁটকি এবং বাঁশের ভেতরে রান্না করা খাবার রাঙ্গামাটির খাদ্যসংস্কৃতিকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।

এ জেলার খাবার শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়, বরং পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। বিশেষ করে বিজু উৎসবের পাজনসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার পাহাড়ি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাঙ্গামাটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এর রয়েছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি। বাঁশের চিকন, বাঁশকোরলের তরকারি, পাহাড়ি মাছ, শুঁটকি, পাজন এবং বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি খাবার এ জেলাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মতো রাঙ্গামাটিরও রয়েছে নিজস্ব খাবারের ঐতিহ্য। এসব স্থানীয় খাবার, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রান্নার পদ্ধতি ও খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা আমাদের সবার দায়িত্ব।

Google Google -এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

আপনার মতামত লিখুন

মুন টাইমস নিউজ

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬


রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত খাবার

প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জেলা রাঙ্গামাটি। পাহাড়, লেক, ঝরনা ও সবুজ প্রকৃতির জন্য পরিচিত এই জেলার রয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী রান্না, বাঁশের ভেতরে রান্না করা খাবার, পাহাড়ি মাছ, শুঁটকি এবং বিভিন্ন ধরনের দেশীয় খাবার রাঙ্গামাটিকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

রাঙ্গামাটির খাবারের বিশেষত্ব হলো এর প্রাকৃতিক উপকরণ ও রান্নার নিজস্ব পদ্ধতি। পাহাড়ে উৎপাদিত বিভিন্ন শাকসবজি, বাঁশকোরল, দেশীয় মসলা, মাছ ও মাংস দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার। চাকমা, মারমা ও অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতির সমন্বয়ে এ জেলার খাবারে তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য।

এ জেলার খাবারের স্বাদে মিশে আছে পাহাড়ি জীবনযাত্রা, প্রকৃতি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।

চলুন জেনে নেওয়া যাক রাঙ্গামাটি জেলার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কিছু খাবার সম্পর্কে।

১. বাঁশের চিকন

রাঙ্গামাটির অন্যতম পরিচিত পাহাড়ি খাবার হলো বাঁশের চিকন। স্থানীয়ভাবে বাঁশের ভেতরে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে রান্না করা খাবার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতির বিশেষ অংশ।

বাঁশের ভেতরে চাল, মাছ, মাংস কিংবা বিভিন্ন মসলা দিয়ে রান্না করা হয়। রান্নার সময় বাঁশের নিজস্ব ঘ্রাণ খাবারের মধ্যে মিশে যায়, যা স্বাদে ভিন্নতা তৈরি করে।

প্রাকৃতিক উপকরণ ও ঐতিহ্যবাহী রান্নার পদ্ধতির কারণে এই খাবার পর্যটকদের কাছেও বেশ আকর্ষণীয়।

২. বাঁশকোরলের তরকারি

রাঙ্গামাটির পাহাড়ি খাবারের তালিকায় বাঁশকোরলের বিশেষ স্থান রয়েছে। বাঁশের কচি অংশকে বাঁশকোরল বলা হয়। পাহাড়ি এলাকায় এটি একটি পরিচিত খাদ্য উপকরণ।

বাঁশকোরল দিয়ে মাছ, মাংস কিংবা বিভিন্ন সবজির সঙ্গে তরকারি রান্না করা হয়। স্থানীয় মসলা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি এই খাবারের স্বাদ অন্যরকম।

বিশেষ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রান্নায় বাঁশকোরলের ব্যবহার বেশ প্রচলিত।

৩. পাহাড়ি মাছের নানা পদ

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ ও আশপাশের জলাশয়ে বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যায়। এ কারণে মাছ এখানকার মানুষের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রুই, কাতলা, কাচকি, চাপিলা, টাকি ও অন্যান্য স্থানীয় মাছ দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের খাবার।

মাছ ভাজা, মাছের ঝোল, সরিষা দিয়ে মাছ রান্না এবং দেশীয় মসলায় তৈরি মাছের তরকারি স্থানীয় মানুষের কাছে জনপ্রিয়।

বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদের মাছ রাঙ্গামাটির খাদ্যসংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৪. পাহাড়ি শুঁটকি

রাঙ্গামাটির পাহাড়ি খাবারের মধ্যে শুঁটকিরও বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মাছ শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুঁটকি।

শুঁটকি দিয়ে ভর্তা, ঝোল ও বিভিন্ন ধরনের তরকারি রান্না করা হয়। পেঁয়াজ, রসুন, শুকনো মরিচ ও দেশীয় মসলা দিয়ে তৈরি শুঁটকির খাবার বেশ সুস্বাদু।

গরম ভাতের সঙ্গে শুঁটকি ভর্তা পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় খাদ্যসংস্কৃতিতেই পরিচিত একটি খাবার।

৫. চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার

রাঙ্গামাটিতে বসবাসকারী চাকমা জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি। তাদের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় পাহাড়ে উৎপাদিত শাকসবজি, মাছ, মাংস ও প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়।

চাকমাদের পরিচিত খাবারের মধ্যে রয়েছে:

  • পাজন
  • হরবাং
  • বাঁশকোরলের তরকারি
  • বিভিন্ন ধরনের শাক ও সবজির পদ
  • মাছ ও মাংসের দেশীয় রান্না

বিশেষ করে পাজন চাকমা জনগোষ্ঠীর একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও দেশীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি এই খাবার উৎসব ও বিশেষ আয়োজনে পরিবেশন করা হয়।

৬. পাজন

রাঙ্গামাটির চাকমা জনগোষ্ঠীর অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবার হলো পাজন। এটি বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও পাহাড়ি সবজি দিয়ে তৈরি করা হয়।

পাজন রান্নায় মৌসুমি শাকসবজি, বাঁশকোরলসহ বিভিন্ন স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়। অঞ্চল ও পরিবারের রন্ধনপ্রণালি অনুযায়ী এর উপকরণ ও স্বাদে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।

বিশেষ করে বিজু উৎসবের সময় পাজন রান্নার প্রচলন রয়েছে। এটি শুধু একটি খাবার নয়, বরং চাকমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৭. মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার

রাঙ্গামাটির মারমা জনগোষ্ঠীরও রয়েছে স্বতন্ত্র খাদ্যসংস্কৃতি। তাদের খাবারে মাছ, মাংস, শাকসবজি, বাঁশকোরল ও বিভিন্ন ধরনের দেশীয় উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়।

মারমাদের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় সাধারণত প্রাকৃতিক উপকরণ ও নিজস্ব মসলার ব্যবহার বেশি গুরুত্ব পায়।

বিভিন্ন উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজনে এসব খাবার পরিবেশন করা হয়। পাহাড়ি খাদ্যসংস্কৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরতে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের গুরুত্ব রয়েছে।

৮. পাহাড়ি শাকসবজির নানা পদ

রাঙ্গামাটির পাহাড়ে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও প্রাকৃতিক খাদ্য উপকরণ পাওয়া যায়। এসব উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার।

পাহাড়ি শাক, কচুশাক, বিভিন্ন বুনো সবজি, বাঁশকোরল ও মৌসুমি সবজি দিয়ে রান্না করা হয় তরকারি ও ভর্তা।

স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় এসব শাকসবজির গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি এসব খাবার রাঙ্গামাটির খাদ্যসংস্কৃতিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

৯. পাহাড়ি মুরগি ও মাংসের নানা পদ

রাঙ্গামাটির গ্রামীণ ও পাহাড়ি খাদ্যসংস্কৃতিতে মুরগি ও বিভিন্ন ধরনের মাংসের খাবারের প্রচলন রয়েছে।

দেশীয় মসলা, পাহাড়ি শাকসবজি, আদা, রসুন ও কাঁচামরিচ দিয়ে মাংস রান্না করা হয়। কোনো কোনো ঐতিহ্যবাহী রান্নায় বাঁশের ভেতরেও মাংস রান্না করা হয়।

বিশেষ করে সামাজিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও অতিথি আপ্যায়নে এসব খাবারের আয়োজন দেখা যায়।

১০. পাহাড়ি ফল ও মৌসুমি ফলের খাবার

রাঙ্গামাটির পাহাড়ি অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল উৎপাদিত হয়। আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেঁপে ও বিভিন্ন পাহাড়ি ফল স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

এসব ফল সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি জুস, শরবত ও বিভিন্ন ধরনের ঘরোয়া খাবার তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।

বিশেষ করে পাহাড়ি আনারস ও অন্যান্য মৌসুমি ফল পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।

রাঙ্গামাটি জেলার খাবারের বিশেষত্ব

রাঙ্গামাটির খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি। চাকমা, মারমা ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী রান্নার মাধ্যমে এ জেলার খাবারে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী স্বাদ ও বৈচিত্র্য।

বাঁশকোরল, পাহাড়ি শাকসবজি, কাপ্তাই হ্রদের মাছ, শুঁটকি এবং বাঁশের ভেতরে রান্না করা খাবার রাঙ্গামাটির খাদ্যসংস্কৃতিকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।

এ জেলার খাবার শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়, বরং পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। বিশেষ করে বিজু উৎসবের পাজনসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার পাহাড়ি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাঙ্গামাটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এর রয়েছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি। বাঁশের চিকন, বাঁশকোরলের তরকারি, পাহাড়ি মাছ, শুঁটকি, পাজন এবং বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি খাবার এ জেলাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মতো রাঙ্গামাটিরও রয়েছে নিজস্ব খাবারের ঐতিহ্য। এসব স্থানীয় খাবার, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রান্নার পদ্ধতি ও খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা আমাদের সবার দায়িত্ব।


মুন টাইমস নিউজ

সম্পাদক: তাবিবুর রহমান তালুকদার
প্রকাশক: জিন্নাহ ফারুক
আইন উপদেষ্টা: এ্যাডঃ মোঃ মাহবুব আলম সরকার

© ২০২৬ মুন টাইমস নিউজ