বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা পিরোজপুর। নদী, খাল, সবুজ প্রকৃতি ও কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রার জন্য জেলাটি বেশ পরিচিত। বিশেষ করে স্বরূপকাঠির পেয়ারা এবং আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার পিরোজপুরকে দেশজুড়ে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
পিরোজপুরের খাদ্যসংস্কৃতিতেও রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। এখানকার সুস্বাদু পেয়ারা, আমড়া, নারকেলের তৈরি মিষ্টি, দেশি মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের পিঠাপুলি স্থানীয় মানুষের খাবারের তালিকায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক পিরোজপুর জেলার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কিছু খাবার সম্পর্কে।
পিরোজপুর জেলার সবচেয়ে পরিচিত কৃষিপণ্যের নাম হলো পেয়ারা। বিশেষ করে নেছারাবাদ উপজেলার স্বরূপকাঠি ও আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকার পেয়ারা বেশ পরিচিত।
এখানকার পেয়ারা সুস্বাদু, রসালো এবং কচকচে। বর্ষাকালে পেয়ারা বাগানগুলোতে ফলের ব্যাপক সমারোহ দেখা যায়।
পিরোজপুরের আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার একটি বিশেষ আকর্ষণ। খালের পানিতে নৌকায় করে কৃষকেরা বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে আসেন এবং নৌকাতেই কেনাবেচা করেন।
পেয়ারা সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি জুস, জেলি, চাটনি ও আচার তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।
পিরোজপুর জেলার আরেকটি পরিচিত ফল হলো আমড়া। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল স্থানীয় মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
কাঁচা আমড়া লবণ ও মরিচ দিয়ে খেতে দারুণ লাগে। এছাড়া আমড়া দিয়ে আচার, চাটনি ও ভর্তা তৈরি করা হয়।
আমড়ার টক স্বাদ খাবারের রুচি বাড়াতে সাহায্য করে। বর্ষা ও শরৎকালে বাজারে আমড়ার ভালো সরবরাহ দেখা যায়।
পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নারকেলের ব্যবহার বেশ প্রচলিত। নারকেল দিয়ে তৈরি নানা ধরনের মিষ্টি স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিত অংশ।
নারকেলের নাড়ু, নারকেলের সন্দেশ এবং নারকেল ও গুড়ের তৈরি মিষ্টি অনেকের কাছে বেশ পছন্দের।
বিশেষ করে উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে নারকেলের তৈরি মিষ্টি পরিবেশন করা হয়।
নদী ও খালবিল ঘেরা পিরোজপুরের মানুষের খাবারের তালিকায় দেশি মাছের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
রুই, কাতলা, টেংরা, শিং, মাগুর, কৈ এবং বিভিন্ন ধরনের ছোট মাছ দিয়ে এখানে নানা রকম তরকারি রান্না করা হয়।
পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, মরিচ ও দেশি মসলার সমন্বয়ে তৈরি মাছের ঝোল গরম ভাতের সঙ্গে খেতে বেশ সুস্বাদু।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতিতে ইলিশ মাছের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। পিরোজপুরেও ইলিশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের রান্না করা হয়।
সরিষা ইলিশ, ইলিশ ভাজা, ইলিশের ঝোল এবং ইলিশ ভর্তা বাঙালির পরিচিত জনপ্রিয় খাবার।
গরম ভাতের সঙ্গে কাঁচামরিচ ও সরিষার মসলায় রান্না করা ইলিশের স্বাদ অনেকের কাছেই অতুলনীয়।
পিরোজপুরের নদী ও জলাভূমি এলাকায় বিভিন্ন ধরনের চিংড়ি পাওয়া যায়। চিংড়ি দিয়ে তৈরি নানা ধরনের রান্না স্থানীয় খাবারের তালিকায় পরিচিত।
চিংড়ি ভুনা, চিংড়ি ভর্তা এবং চিংড়ি দিয়ে শাক রান্না বেশ সুস্বাদু খাবার।
পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচ ও দেশি মসলার সঙ্গে চিংড়ি রান্না করলে খাবারে আলাদা স্বাদ তৈরি হয়।
শীতকালে পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। এই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড় ও পাটালি।
খেজুরের গুড় দিয়ে পায়েস, পিঠা, নাড়ু এবং নানা ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়।
বিশেষ করে শীতের সকালে গরম ভাপা পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড় খাওয়ার স্বাদ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।
পিরোজপুরের গ্রামাঞ্চলে শীতকালে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরির প্রচলন রয়েছে।
ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, পুলি পিঠা ও দুধচিতই বাঙালির পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবার।
চালের গুঁড়া, নারকেল, দুধ এবং খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি এসব পিঠা শীতের মৌসুমে মানুষের খাবারের তালিকায় বিশেষ জায়গা দখল করে।
দুধ দিয়ে তৈরি পায়েস ও ক্ষীর পিরোজপুরের বিভিন্ন পরিবারের পরিচিত মিষ্টান্নের অংশ।
চাল, দুধ, চিনি কিংবা খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পায়েস পারিবারিক অনুষ্ঠান, উৎসব এবং অতিথি আপ্যায়নে পরিবেশন করা হয়।
নারকেল ও গুড়ের সংমিশ্রণে তৈরি পায়েসের স্বাদ আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
পিরোজপুরের খাবারের বিশেষত্ব হলো এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষি ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার প্রভাব। স্বরূপকাঠির পেয়ারা, স্থানীয় আমড়া, নারকেল, দেশি মাছ এবং মৌসুমি ফলমূল এখানকার খাদ্যসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
বিশেষ করে আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার পিরোজপুরের কৃষি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। বর্ষাকালে এই বাজারে নৌকায় করে পেয়ারা কেনাবেচার দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা আসেন।
পিরোজপুর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভাসমান পেয়ারা বাজারের জন্যই বিখ্যাত নয়, এখানকার খাদ্যসংস্কৃতিও বেশ সমৃদ্ধ। স্বরূপকাঠির সুস্বাদু পেয়ারা, টক-মিষ্টি আমড়া, নারকেলের তৈরি মিষ্টি, দেশি মাছের ঝোল, চিংড়ি এবং শীতের পিঠাপুলি এ জেলার খাবারের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
তাই পিরোজপুর ভ্রমণে গেলে আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে দেখার পাশাপাশি স্থানীয় ফল ও খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। এখানকার খাবার ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আপনার ভ্রমণকে আরও আনন্দময় ও স্মরণীয় করে তুলবে।
Google
-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা পিরোজপুর। নদী, খাল, সবুজ প্রকৃতি ও কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রার জন্য জেলাটি বেশ পরিচিত। বিশেষ করে স্বরূপকাঠির পেয়ারা এবং আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার পিরোজপুরকে দেশজুড়ে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
পিরোজপুরের খাদ্যসংস্কৃতিতেও রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। এখানকার সুস্বাদু পেয়ারা, আমড়া, নারকেলের তৈরি মিষ্টি, দেশি মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের পিঠাপুলি স্থানীয় মানুষের খাবারের তালিকায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক পিরোজপুর জেলার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কিছু খাবার সম্পর্কে।
পিরোজপুর জেলার সবচেয়ে পরিচিত কৃষিপণ্যের নাম হলো পেয়ারা। বিশেষ করে নেছারাবাদ উপজেলার স্বরূপকাঠি ও আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকার পেয়ারা বেশ পরিচিত।
এখানকার পেয়ারা সুস্বাদু, রসালো এবং কচকচে। বর্ষাকালে পেয়ারা বাগানগুলোতে ফলের ব্যাপক সমারোহ দেখা যায়।
পিরোজপুরের আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার একটি বিশেষ আকর্ষণ। খালের পানিতে নৌকায় করে কৃষকেরা বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে আসেন এবং নৌকাতেই কেনাবেচা করেন।
পেয়ারা সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি জুস, জেলি, চাটনি ও আচার তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।
পিরোজপুর জেলার আরেকটি পরিচিত ফল হলো আমড়া। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল স্থানীয় মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
কাঁচা আমড়া লবণ ও মরিচ দিয়ে খেতে দারুণ লাগে। এছাড়া আমড়া দিয়ে আচার, চাটনি ও ভর্তা তৈরি করা হয়।
আমড়ার টক স্বাদ খাবারের রুচি বাড়াতে সাহায্য করে। বর্ষা ও শরৎকালে বাজারে আমড়ার ভালো সরবরাহ দেখা যায়।
পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নারকেলের ব্যবহার বেশ প্রচলিত। নারকেল দিয়ে তৈরি নানা ধরনের মিষ্টি স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিত অংশ।
নারকেলের নাড়ু, নারকেলের সন্দেশ এবং নারকেল ও গুড়ের তৈরি মিষ্টি অনেকের কাছে বেশ পছন্দের।
বিশেষ করে উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে নারকেলের তৈরি মিষ্টি পরিবেশন করা হয়।
নদী ও খালবিল ঘেরা পিরোজপুরের মানুষের খাবারের তালিকায় দেশি মাছের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
রুই, কাতলা, টেংরা, শিং, মাগুর, কৈ এবং বিভিন্ন ধরনের ছোট মাছ দিয়ে এখানে নানা রকম তরকারি রান্না করা হয়।
পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, মরিচ ও দেশি মসলার সমন্বয়ে তৈরি মাছের ঝোল গরম ভাতের সঙ্গে খেতে বেশ সুস্বাদু।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের খাদ্যসংস্কৃতিতে ইলিশ মাছের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। পিরোজপুরেও ইলিশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের রান্না করা হয়।
সরিষা ইলিশ, ইলিশ ভাজা, ইলিশের ঝোল এবং ইলিশ ভর্তা বাঙালির পরিচিত জনপ্রিয় খাবার।
গরম ভাতের সঙ্গে কাঁচামরিচ ও সরিষার মসলায় রান্না করা ইলিশের স্বাদ অনেকের কাছেই অতুলনীয়।
পিরোজপুরের নদী ও জলাভূমি এলাকায় বিভিন্ন ধরনের চিংড়ি পাওয়া যায়। চিংড়ি দিয়ে তৈরি নানা ধরনের রান্না স্থানীয় খাবারের তালিকায় পরিচিত।
চিংড়ি ভুনা, চিংড়ি ভর্তা এবং চিংড়ি দিয়ে শাক রান্না বেশ সুস্বাদু খাবার।
পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচ ও দেশি মসলার সঙ্গে চিংড়ি রান্না করলে খাবারে আলাদা স্বাদ তৈরি হয়।
শীতকালে পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খেজুরের রস সংগ্রহ করা হয়। এই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড় ও পাটালি।
খেজুরের গুড় দিয়ে পায়েস, পিঠা, নাড়ু এবং নানা ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়।
বিশেষ করে শীতের সকালে গরম ভাপা পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড় খাওয়ার স্বাদ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।
পিরোজপুরের গ্রামাঞ্চলে শীতকালে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরির প্রচলন রয়েছে।
ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, পুলি পিঠা ও দুধচিতই বাঙালির পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবার।
চালের গুঁড়া, নারকেল, দুধ এবং খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি এসব পিঠা শীতের মৌসুমে মানুষের খাবারের তালিকায় বিশেষ জায়গা দখল করে।
দুধ দিয়ে তৈরি পায়েস ও ক্ষীর পিরোজপুরের বিভিন্ন পরিবারের পরিচিত মিষ্টান্নের অংশ।
চাল, দুধ, চিনি কিংবা খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পায়েস পারিবারিক অনুষ্ঠান, উৎসব এবং অতিথি আপ্যায়নে পরিবেশন করা হয়।
নারকেল ও গুড়ের সংমিশ্রণে তৈরি পায়েসের স্বাদ আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
পিরোজপুরের খাবারের বিশেষত্ব হলো এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষি ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার প্রভাব। স্বরূপকাঠির পেয়ারা, স্থানীয় আমড়া, নারকেল, দেশি মাছ এবং মৌসুমি ফলমূল এখানকার খাদ্যসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
বিশেষ করে আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার পিরোজপুরের কৃষি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। বর্ষাকালে এই বাজারে নৌকায় করে পেয়ারা কেনাবেচার দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা আসেন।
পিরোজপুর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভাসমান পেয়ারা বাজারের জন্যই বিখ্যাত নয়, এখানকার খাদ্যসংস্কৃতিও বেশ সমৃদ্ধ। স্বরূপকাঠির সুস্বাদু পেয়ারা, টক-মিষ্টি আমড়া, নারকেলের তৈরি মিষ্টি, দেশি মাছের ঝোল, চিংড়ি এবং শীতের পিঠাপুলি এ জেলার খাবারের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
তাই পিরোজপুর ভ্রমণে গেলে আটঘর-কুড়িয়ানার ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে দেখার পাশাপাশি স্থানীয় ফল ও খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। এখানকার খাবার ও প্রাকৃতিক পরিবেশ আপনার ভ্রমণকে আরও আনন্দময় ও স্মরণীয় করে তুলবে।

আপনার মতামত লিখুন