বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের একটি সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী জেলা ঝালকাঠি। নদী, খাল, সবুজ প্রকৃতি এবং কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রার জন্য জেলাটি বিশেষভাবে পরিচিত। তবে ঝালকাঠির পরিচিতির অন্যতম বড় অংশ হলো এখানকার সুস্বাদু পেয়ারা ও আমড়া। পাশাপাশি স্থানীয় মাছ, পিঠাপুলি, গুড় এবং নানা ধরনের ঘরোয়া খাবার এ জেলার খাদ্যসংস্কৃতিকে করেছে বৈচিত্র্যময়।
বিশেষ করে ঝালকাঠির ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার দেশজুড়ে পরিচিত। বর্ষাকালে নৌকায় করে পেয়ারা কেনাবেচার এই দৃশ্য পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক ঝালকাঠি জেলার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কিছু খাবার সম্পর্কে।
ঝালকাঠি জেলার সবচেয়ে পরিচিত কৃষিপণ্য হলো পেয়ারা। জেলার সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ও নবগ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ হয়ে আসছে।
এখানকার পেয়ারা সুস্বাদু, রসালো এবং কচকচে। বর্ষা মৌসুমে বিশেষ করে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পেয়ারার ব্যাপক উৎপাদন হয়।
ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজারে কৃষকেরা নৌকায় করে বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে আসেন। খালের ওপর নৌকায় নৌকায় বসে এই বাজারের কেনাবেচা এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে।
পেয়ারা সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি এটি দিয়ে জুস, চাটনি ও আচারও তৈরি করা যায়।
ঝালকাঠি ও বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের আরেকটি পরিচিত ফল হলো আমড়া। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল স্থানীয় মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
কাঁচা আমড়া লবণ ও মরিচ দিয়ে খেতে দারুণ লাগে। এছাড়া আমড়ার আচার, চাটনি এবং ভর্তাও তৈরি করা হয়। বর্ষা ও শরৎকালে বাজারে আমড়ার ভালো সরবরাহ দেখা যায়।
ঝালকাঠির পেয়ারা দিয়ে তৈরি আচার হতে পারে স্থানীয় ফলের একটি সুস্বাদু ব্যবহার। পাকা বা কাঁচা পেয়ারা, চিনি কিংবা গুড়, লবণ ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি করা যায় টক-মিষ্টি আচার।
অনেকের কাছে ভাতের সঙ্গে কিংবা বিকেলের নাশতায় পেয়ারার আচার বেশ পছন্দের।
নদী-খাল ও জলাভূমি ঘেরা ঝালকাঠির মানুষের খাবারের তালিকায় মাছের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।
রুই, কাতলা, টেংরা, শিং, মাগুর, কৈ এবং অন্যান্য দেশি মাছ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের তরকারি রান্না করা হয়। সরিষা, পেঁয়াজ, রসুন ও কাঁচামরিচের মসলায় তৈরি মাছের ঝোল গরম ভাতের সঙ্গে বেশ সুস্বাদু।
দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে ইলিশ মাছের বিশেষ স্থান রয়েছে। ঝালকাঠিতেও ইলিশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের রান্না করা হয়।
ইলিশ ভাজা, সরিষা ইলিশ, ইলিশের ঝোল ও ইলিশ ভর্তা বাঙালির পরিচিত জনপ্রিয় খাবার। গরম ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছের স্বাদ অনেক খাবারপ্রেমীর কাছেই বিশেষ আকর্ষণীয়।
শীত মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খেজুরের রস সংগ্রহের প্রচলন রয়েছে। এই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড় ও পাটালি।
খেজুরের গুড় দিয়ে পায়েস, পিঠা এবং নানা ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। শীতের সকালে গরম পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড়ের স্বাদ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।
ঝালকাঠির গ্রামাঞ্চলে শীতকালে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরির প্রচলন রয়েছে।
ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, পুলি পিঠা ও দুধচিতই বাঙালির পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবার। চালের গুঁড়া, নারকেল, দুধ ও খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি এসব পিঠা শীতের খাবারের তালিকায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের রান্নায় নারকেলের ব্যবহার বেশ পরিচিত। ঝালকাঠির বিভিন্ন এলাকায় নারকেল দিয়ে নানা ধরনের পিঠা, নাড়ু ও মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়।
নারকেলের দুধ দিয়ে রান্না করা খাবার এবং নারকেল-গুড়ের মিশ্রণে তৈরি মিষ্টি গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশ।
দুধ দিয়ে তৈরি পায়েস, ক্ষীর ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবারের অংশ। ঝালকাঠির বিভিন্ন পরিবারেও উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে এসব খাবার তৈরি করা হয়।
চাল, দুধ, চিনি এবং খেজুরের গুড়ের সমন্বয়ে তৈরি পায়েসের স্বাদ বিশেষভাবে উপভোগ্য।
ঝালকাঠির খাবারের বিশেষত্ব হলো এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি এবং নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার প্রভাব। পেয়ারার বাগান, আমড়ার উৎপাদন, দেশি মাছ এবং মৌসুমি ফলমূল এখানকার খাদ্যসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
বিশেষ করে ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার ঝালকাঠির কৃষি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। এখানকার ফলের স্বাদ গ্রহণের পাশাপাশি নৌকায় ভাসমান বাজার ঘুরে দেখাও পর্যটকদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা।
ঝালকাঠি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভাসমান পেয়ারা বাজারের জন্যই বিখ্যাত নয়, এখানকার খাদ্যসংস্কৃতিও বেশ সমৃদ্ধ। সুস্বাদু পেয়ারা, টক-মিষ্টি আমড়া, পেয়ারার আচার, দেশি মাছের ঝোল, ইলিশের বিভিন্ন পদ এবং শীতের পিঠাপুলি এ অঞ্চলের মানুষের খাবারের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
তাই ঝালকাঠি ভ্রমণে গেলে ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে দেখার পাশাপাশি স্থানীয় ফল ও খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। এতে আপনার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও আনন্দময় ও স্মরণীয় হয়ে উঠবে।
Google
-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের বরিশাল বিভাগের একটি সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী জেলা ঝালকাঠি। নদী, খাল, সবুজ প্রকৃতি এবং কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রার জন্য জেলাটি বিশেষভাবে পরিচিত। তবে ঝালকাঠির পরিচিতির অন্যতম বড় অংশ হলো এখানকার সুস্বাদু পেয়ারা ও আমড়া। পাশাপাশি স্থানীয় মাছ, পিঠাপুলি, গুড় এবং নানা ধরনের ঘরোয়া খাবার এ জেলার খাদ্যসংস্কৃতিকে করেছে বৈচিত্র্যময়।
বিশেষ করে ঝালকাঠির ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার দেশজুড়ে পরিচিত। বর্ষাকালে নৌকায় করে পেয়ারা কেনাবেচার এই দৃশ্য পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক ঝালকাঠি জেলার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কিছু খাবার সম্পর্কে।
ঝালকাঠি জেলার সবচেয়ে পরিচিত কৃষিপণ্য হলো পেয়ারা। জেলার সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ও নবগ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ হয়ে আসছে।
এখানকার পেয়ারা সুস্বাদু, রসালো এবং কচকচে। বর্ষা মৌসুমে বিশেষ করে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পেয়ারার ব্যাপক উৎপাদন হয়।
ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজারে কৃষকেরা নৌকায় করে বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে আসেন। খালের ওপর নৌকায় নৌকায় বসে এই বাজারের কেনাবেচা এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে।
পেয়ারা সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি এটি দিয়ে জুস, চাটনি ও আচারও তৈরি করা যায়।
ঝালকাঠি ও বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের আরেকটি পরিচিত ফল হলো আমড়া। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল স্থানীয় মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
কাঁচা আমড়া লবণ ও মরিচ দিয়ে খেতে দারুণ লাগে। এছাড়া আমড়ার আচার, চাটনি এবং ভর্তাও তৈরি করা হয়। বর্ষা ও শরৎকালে বাজারে আমড়ার ভালো সরবরাহ দেখা যায়।
ঝালকাঠির পেয়ারা দিয়ে তৈরি আচার হতে পারে স্থানীয় ফলের একটি সুস্বাদু ব্যবহার। পাকা বা কাঁচা পেয়ারা, চিনি কিংবা গুড়, লবণ ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি করা যায় টক-মিষ্টি আচার।
অনেকের কাছে ভাতের সঙ্গে কিংবা বিকেলের নাশতায় পেয়ারার আচার বেশ পছন্দের।
নদী-খাল ও জলাভূমি ঘেরা ঝালকাঠির মানুষের খাবারের তালিকায় মাছের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।
রুই, কাতলা, টেংরা, শিং, মাগুর, কৈ এবং অন্যান্য দেশি মাছ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের তরকারি রান্না করা হয়। সরিষা, পেঁয়াজ, রসুন ও কাঁচামরিচের মসলায় তৈরি মাছের ঝোল গরম ভাতের সঙ্গে বেশ সুস্বাদু।
দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে ইলিশ মাছের বিশেষ স্থান রয়েছে। ঝালকাঠিতেও ইলিশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের রান্না করা হয়।
ইলিশ ভাজা, সরিষা ইলিশ, ইলিশের ঝোল ও ইলিশ ভর্তা বাঙালির পরিচিত জনপ্রিয় খাবার। গরম ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছের স্বাদ অনেক খাবারপ্রেমীর কাছেই বিশেষ আকর্ষণীয়।
শীত মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খেজুরের রস সংগ্রহের প্রচলন রয়েছে। এই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু খেজুরের গুড় ও পাটালি।
খেজুরের গুড় দিয়ে পায়েস, পিঠা এবং নানা ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়। শীতের সকালে গরম পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড়ের স্বাদ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয়।
ঝালকাঠির গ্রামাঞ্চলে শীতকালে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরির প্রচলন রয়েছে।
ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, পুলি পিঠা ও দুধচিতই বাঙালির পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খাবার। চালের গুঁড়া, নারকেল, দুধ ও খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি এসব পিঠা শীতের খাবারের তালিকায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের রান্নায় নারকেলের ব্যবহার বেশ পরিচিত। ঝালকাঠির বিভিন্ন এলাকায় নারকেল দিয়ে নানা ধরনের পিঠা, নাড়ু ও মিষ্টান্ন তৈরি করা হয়।
নারকেলের দুধ দিয়ে রান্না করা খাবার এবং নারকেল-গুড়ের মিশ্রণে তৈরি মিষ্টি গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশ।
দুধ দিয়ে তৈরি পায়েস, ক্ষীর ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবারের অংশ। ঝালকাঠির বিভিন্ন পরিবারেও উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নে এসব খাবার তৈরি করা হয়।
চাল, দুধ, চিনি এবং খেজুরের গুড়ের সমন্বয়ে তৈরি পায়েসের স্বাদ বিশেষভাবে উপভোগ্য।
ঝালকাঠির খাবারের বিশেষত্ব হলো এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি এবং নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার প্রভাব। পেয়ারার বাগান, আমড়ার উৎপাদন, দেশি মাছ এবং মৌসুমি ফলমূল এখানকার খাদ্যসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
বিশেষ করে ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার ঝালকাঠির কৃষি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। এখানকার ফলের স্বাদ গ্রহণের পাশাপাশি নৌকায় ভাসমান বাজার ঘুরে দেখাও পর্যটকদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা।
ঝালকাঠি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ভাসমান পেয়ারা বাজারের জন্যই বিখ্যাত নয়, এখানকার খাদ্যসংস্কৃতিও বেশ সমৃদ্ধ। সুস্বাদু পেয়ারা, টক-মিষ্টি আমড়া, পেয়ারার আচার, দেশি মাছের ঝোল, ইলিশের বিভিন্ন পদ এবং শীতের পিঠাপুলি এ অঞ্চলের মানুষের খাবারের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
তাই ঝালকাঠি ভ্রমণে গেলে ভীমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে দেখার পাশাপাশি স্থানীয় ফল ও খাবারের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। এতে আপনার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও আনন্দময় ও স্মরণীয় হয়ে উঠবে।

আপনার মতামত লিখুন