৭০০ টাকা নিয়ে ঢাকায়, সাফের স্বপ্নে সাঁওতাল তরুণ রাফায়েল টুডু
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর প্রত্যন্ত আদিবাসী সাঁওতাল পাড়া থেকে ফুটবলের বড় মঞ্চে উঠে এসেছেন রাফায়েল টুডু। পকেটে মাত্র ৭০০ টাকা নিয়ে একরাতে ট্রেনে চড়ে ঢাকায় এসেছিলেন ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে। পথচলায় এসেছে দারিদ্র্য, বাধা আর প্রিয় বাবাকে হারানোর মতো কঠিন শোক। তবুও থামেননি এই তরুণ। এখন তাঁর চোখ জাতীয় দলের লাল-সবুজ জার্সিতে এবং সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের মঞ্চে খেলার স্বপ্নে।একটি অনুশীলন বদলে দেয় রাফায়েল টুডুর জীবন। সেদিন বাবাকে অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে রেখে ফুটবল অনুশীলনে গিয়েছিলেন তিনি। অনুশীলন শেষে বাড়ি ফিরে দেখেন, বাবা আর নেই। প্রিয় মানুষটির নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে ভেঙে পড়েছিলেন রাফায়েল।বাবাকে হারানোর সেই শোক আজও তাঁকে তাড়া করে। বাবার কথা মনে পড়লেই চোখে পানি চলে আসে। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে ফুটবলের পথেই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে একরাতে ট্রেনে চড়ে রাজশাহী থেকে ঢাকায় এসেছিলেন রাফায়েল। লক্ষ্য ছিল একটাই, ফুটবলার হওয়া। কিন্তু স্বপ্নের পথে তাঁর সামনে ছিল অর্থকষ্ট, অনিশ্চয়তা আর নানা প্রতিকূলতা।কৃষক বাবার সন্তান, স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়াররাজশাহীর গোদাগাড়ীর আমতলীপাড়ার একটি সাঁওতাল পরিবারে জন্ম রাফায়েল টুডুর। বাবা ছিলেন কৃষক। চার ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।গ্রামের অনেকেই তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, ফুটবল খেলে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো কৃষিকাজই করতে হবে। কিন্তু অন্যদের কথায় নিজের স্বপ্ন থেকে সরে যাননি রাফায়েল। বিশ্বাস রেখেছেন নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রমের ওপর।গোলরক্ষক থেকে স্ট্রাইকারফুটবলে রাফায়েলের যাত্রা অবশ্য স্ট্রাইকার হিসেবে শুরু হয়নি। ২০২০-২১ মৌসুমে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিংয়ের হয়ে গোলরক্ষক হিসেবে খেলেছেন তিনি। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়ায় ফিরে যান রাজশাহীতে। সেখানেই বদলে যায় তাঁর ফুটবলজীবনের গতিপথ। লিওনেল মেসির খেলা তাঁকে আক্রমণভাগে খেলার জন্য অনুপ্রাণিত করে। গোলপোস্ট ছেড়ে নেমে আসেন মাঠের সামনে। ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন স্ট্রাইকার হিসেবে। সেই সিদ্ধান্তই যেন বদলে দেয় তাঁর ক্যারিয়ার।৯ ম্যাচে ১২ গোল, এক ম্যাচেই চারফকিরাপুল ইয়ংমেনসের জার্সিতে সুযোগ পেয়েই নিজের সামর্থ্যের জানান দেন রাফায়েল। মাত্র ৯ ম্যাচে করেন ১২ গোল। এর মধ্যে এক ম্যাচেই করেন চার গোল। এই পারফরম্যান্স তাঁকে এনে দেয় লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি। একই সঙ্গে জেতেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও। এরপর ইস্পাহানি-প্রথম আলো আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবলেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন এই তরুণ। পাঁচ ম্যাচে করেন আট গোল। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতে।আন্তর্জাতিক মঞ্চেও গোলশুধু ঘরোয়া ফুটবলেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্লাব প্রতিযোগিতাতেও নজর কেড়েছেন রাফায়েল। এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে ভারতের এফসি গোয়া এবং তাজিকিস্তানের রেজারের বিপক্ষে গোল করেছেন তিনি। একের পর এক এমন পারফরম্যান্সের পর স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসে একটি প্রশ্ন ‘সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে রাফায়েল টুডু কোথায়?’১৮ অক্টোবর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ২৮ ফুটবলারের তালিকা জমা দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সেই তালিকায় জায়গা হয়নি আলোচিত এই স্ট্রাইকারের। জাতীয় দলের ক্যাম্পে অনুশীলনের জন্য আরও কয়েকজন ফুটবলারকে ডাকা হলেও রাফায়েলকে পরখ করার সুযোগ দেওয়া হবে কি না, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।সাফে খেলতে না পারলে বাংলাদেশের হয়ে গলা ফাটাবোজাতীয় দলের স্কোয়াডে জায়গা না পেলেও স্বপ্ন দেখা থামাননি রাফায়েল। এই তরুণের কাছে জাতীয় দলের হয়ে খেলার স্বপ্ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর শিকড়, পরিচয় এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা। রাফায়েল টুডু বলছেন, শেষ পর্যন্ত সাফে খেলতে না পারলেও বাংলাদেশের হয়ে গলা ফাটাব। আমি আদিবাসী, ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’।এই কথার মধ্যেই যেন ফুটে ওঠে তাঁর লড়াইয়ের গল্প। প্রান্তিক একটি সাঁওতাল পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে প্রমাণ করার আকাঙ্ক্ষা।স্বপ্ন এখনো থামেনিরাফায়েল টুডুর গল্প কেবল গোল, ম্যাচ কিংবা ফুটবলীয় পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি একজন তরুণের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প। এটি সেই ছেলের গল্প, যে বাবাকে হারিয়েও স্বপ্নের পথ থেকে সরে যায়নি। যে মাত্র ৭০০ টাকা নিয়ে একরাতে ট্রেনে চড়ে ঢাকায় এসেছিল নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে। যে গোলরক্ষক থেকে নিজেকে রূপান্তর করেছে স্ট্রাইকারে। আর নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায়। সাফের ২৮ জনের তালিকায় হয়তো এখনো তাঁর নাম নেই। কিন্তু রাফায়েলের লড়াই এখানেই শেষ নয়।কারণ কিছু স্বপ্ন স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার আগেই শুরু হয়। আর কিছু স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থামে না। সাঁওতাল পাড়া থেকে লাল-সবুজের স্বপ্ন দেখা রাফায়েল টুডুর সেই লড়াই তাই এখনো চলমান।