উত্তরবঙ্গের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁ জেলা তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, প্রাচীন নিদর্শন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি দারুণ সব সুস্বাদু খাবারের জন্যও বেশ সমাদৃত। বরেন্দ্র ভূমির উর্বর মাটি ও ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে এ অঞ্চলের রান্নাবান্না ও খাবারে। নওগাঁর ভ্রমণ মানেই কেবল ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখা নয়, বরং এখানকার ঐতিহ্যবাহী স্বাদের ছোঁয়া নেওয়া।
চলুন জেনে নেওয়া যাক নওগাঁ জেলার জনপ্রিয় ও বিখ্যাত কিছু খাবার সম্পর্কে:
নওগাঁ জেলার নাম শুনলেই সবার আগে যার নাম মাথায় আসে, তা হলো বদলগাছীর বিখ্যাত প্যারা সন্দেশ। প্রায় শতবর্ষের ইতিহাস রয়েছে এই বিশেষ মিষ্টির।
বিশেষত্ব: খাঁটি দুধের ছানা এবং চিনির দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে ঘন করার মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়। এতে অতিরিক্ত কোনো কেমিক্যাল বা কৃত্রিম ফ্লেভার ব্যবহার করা হয় না।
স্বাদ: মুখে দিলেই মিলিয়ে যাওয়ার মতো এক অপূর্ব মিষ্টি স্বাদ এবং দুধের ঘ্রাণ এই সন্দেশকে অনন্য করে তুলেছে। নওগাঁয় গেলে প্যারা সন্দেশ চেখে দেখা বা সাথে করে নিয়ে আসা এক প্রকার বাধ্যতামূলক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নওগাঁর গ্রামবাংলায় শীত ও উৎসবে নানা পদের পিঠার কদর রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে শীতের সকালে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা এবং নানা ধরনের নকশী পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুগন্ধি চালের তৈরি ভাত ও পোলাওয়ের সুবাস এখানকার প্রতিটি ঘরকে মাতিয়ে রাখে।
উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলার মতো নওগাঁতেও খেসারি বা মাসকলাইয়ের ডাল দিয়ে তৈরি কালাইয়ের রুটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
উপাদান ও পরিবেশন: চালের গুঁড়ো এবং কলাইয়ের ডাল মিশিয়ে মাটির খোলায় এই রুটি তৈরি করা হয়।
সঙ্গী: গরম গরম এই কালাইয়ের রুটি সরিষার তেল-মরিচ দিয়ে মাখানো বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তা কিংবা হাঁসের মাংসের ভুনা দিয়ে খাওয়ার মজাই আলাদা। নওগাঁর বিভিন্ন লোকাল রেস্তোরাঁ ও মেলায় এই খাবারের দারুণ চাহিদা রয়েছে।
নওগাঁ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই, ছোট যমুনা, তুলসীগঙ্গা ও পুনর্ভবা নদীর মতো জলপ্রবাহ। এসব নদীর তাজা মাছ স্থানীয় খাবারের টেবিলে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। বিশেষ করে ছোট যমুনার মাছের ঝোল, মাছের মাথা দিয়ে ডাল এবং রুই-কাতলার দোসিয়া এখানকার মানুষের অত্যন্ত প্রিয়।
প্যারা সন্দেশ ছাড়াও নওগাঁর বিভিন্ন বাজার ও মিষ্টির দোকানে ঐতিহ্যবাহী দই, রসমলাই এবং চমচম পাওয়া যায়। এখানকার স্থানীয় গো-পালন ব্যবস্থার কারণে দুধের মান ভালো হওয়ায় এখানকার মিষ্টিজাত দ্রব্যের স্বাদ শহরের অন্য অনেক জায়গার চেয়ে আলাদা ও সুস্বাদু হয়।
নওগাঁর খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর কৃষিনির্ভর খাদ্যসংস্কৃতি। ধান ও চাল উৎপাদনের জন্য পরিচিত এ জেলায় চালের তৈরি খাবারের বৈচিত্র্য অনেক বেশি।
এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন খাবারে ভাত, মাছ, ডাল ও বিভিন্ন ধরনের ভর্তার প্রচলন রয়েছে। পাশাপাশি দুধ, দই, ছানার মিষ্টি এবং খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি খাবার স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শীতকালীন পিঠাপুলি নওগাঁর গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন ধানের চালের গুঁড়া, নারকেল, দুধ ও খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা এ অঞ্চলের মানুষের উৎসব ও পারিবারিক আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
নওগাঁ শুধু কৃষি ও ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্যই পরিচিত নয়, বরং এর রয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্য। ধান-চালের তৈরি খাবার, দই, ছানার মিষ্টি, খেজুরের গুড়, দেশি মাছ এবং শীতকালীন পিঠাপুলি এ জেলার খাবারের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মতো নওগাঁরও রয়েছে নিজস্ব খাবারের ঐতিহ্য। এসব স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য ও খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা আমাদের সবার দায়িত্ব।
Google
-এ পছন্দের সংবাদ উৎস হিসেবে যোগ করুন

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬
উত্তরবঙ্গের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নওগাঁ জেলা তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, প্রাচীন নিদর্শন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি দারুণ সব সুস্বাদু খাবারের জন্যও বেশ সমাদৃত। বরেন্দ্র ভূমির উর্বর মাটি ও ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে এ অঞ্চলের রান্নাবান্না ও খাবারে। নওগাঁর ভ্রমণ মানেই কেবল ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখা নয়, বরং এখানকার ঐতিহ্যবাহী স্বাদের ছোঁয়া নেওয়া।
চলুন জেনে নেওয়া যাক নওগাঁ জেলার জনপ্রিয় ও বিখ্যাত কিছু খাবার সম্পর্কে:
নওগাঁ জেলার নাম শুনলেই সবার আগে যার নাম মাথায় আসে, তা হলো বদলগাছীর বিখ্যাত প্যারা সন্দেশ। প্রায় শতবর্ষের ইতিহাস রয়েছে এই বিশেষ মিষ্টির।
বিশেষত্ব: খাঁটি দুধের ছানা এবং চিনির দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে ঘন করার মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়। এতে অতিরিক্ত কোনো কেমিক্যাল বা কৃত্রিম ফ্লেভার ব্যবহার করা হয় না।
স্বাদ: মুখে দিলেই মিলিয়ে যাওয়ার মতো এক অপূর্ব মিষ্টি স্বাদ এবং দুধের ঘ্রাণ এই সন্দেশকে অনন্য করে তুলেছে। নওগাঁয় গেলে প্যারা সন্দেশ চেখে দেখা বা সাথে করে নিয়ে আসা এক প্রকার বাধ্যতামূলক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নওগাঁর গ্রামবাংলায় শীত ও উৎসবে নানা পদের পিঠার কদর রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে শীতের সকালে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা এবং নানা ধরনের নকশী পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুগন্ধি চালের তৈরি ভাত ও পোলাওয়ের সুবাস এখানকার প্রতিটি ঘরকে মাতিয়ে রাখে।
উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলার মতো নওগাঁতেও খেসারি বা মাসকলাইয়ের ডাল দিয়ে তৈরি কালাইয়ের রুটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
উপাদান ও পরিবেশন: চালের গুঁড়ো এবং কলাইয়ের ডাল মিশিয়ে মাটির খোলায় এই রুটি তৈরি করা হয়।
সঙ্গী: গরম গরম এই কালাইয়ের রুটি সরিষার তেল-মরিচ দিয়ে মাখানো বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তা কিংবা হাঁসের মাংসের ভুনা দিয়ে খাওয়ার মজাই আলাদা। নওগাঁর বিভিন্ন লোকাল রেস্তোরাঁ ও মেলায় এই খাবারের দারুণ চাহিদা রয়েছে।
নওগাঁ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই, ছোট যমুনা, তুলসীগঙ্গা ও পুনর্ভবা নদীর মতো জলপ্রবাহ। এসব নদীর তাজা মাছ স্থানীয় খাবারের টেবিলে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। বিশেষ করে ছোট যমুনার মাছের ঝোল, মাছের মাথা দিয়ে ডাল এবং রুই-কাতলার দোসিয়া এখানকার মানুষের অত্যন্ত প্রিয়।
প্যারা সন্দেশ ছাড়াও নওগাঁর বিভিন্ন বাজার ও মিষ্টির দোকানে ঐতিহ্যবাহী দই, রসমলাই এবং চমচম পাওয়া যায়। এখানকার স্থানীয় গো-পালন ব্যবস্থার কারণে দুধের মান ভালো হওয়ায় এখানকার মিষ্টিজাত দ্রব্যের স্বাদ শহরের অন্য অনেক জায়গার চেয়ে আলাদা ও সুস্বাদু হয়।
নওগাঁর খাবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর কৃষিনির্ভর খাদ্যসংস্কৃতি। ধান ও চাল উৎপাদনের জন্য পরিচিত এ জেলায় চালের তৈরি খাবারের বৈচিত্র্য অনেক বেশি।
এ অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন খাবারে ভাত, মাছ, ডাল ও বিভিন্ন ধরনের ভর্তার প্রচলন রয়েছে। পাশাপাশি দুধ, দই, ছানার মিষ্টি এবং খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি খাবার স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শীতকালীন পিঠাপুলি নওগাঁর গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন ধানের চালের গুঁড়া, নারকেল, দুধ ও খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা এ অঞ্চলের মানুষের উৎসব ও পারিবারিক আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
নওগাঁ শুধু কৃষি ও ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্যই পরিচিত নয়, বরং এর রয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্য। ধান-চালের তৈরি খাবার, দই, ছানার মিষ্টি, খেজুরের গুড়, দেশি মাছ এবং শীতকালীন পিঠাপুলি এ জেলার খাবারের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মতো নওগাঁরও রয়েছে নিজস্ব খাবারের ঐতিহ্য। এসব স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য ও খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা আমাদের সবার দায়িত্ব।

আপনার মতামত লিখুন