মুন টাইমস নিউজ

নেত্রকোনা জেলার বিখ্যাত খাবার

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা নেত্রকোনা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হাওর-বাঁওড়, নদ-নদী, পাহাড় এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য জেলাটি দেশজুড়ে পরিচিত। তবে নেত্রকোনার নাম শুনলেই সবার আগে যে খাবারটির কথা মনে পড়ে, সেটি হলো বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি।শুধু বালিশ মিষ্টিই নয়, নেত্রকোনার হাওরের মাছ, শুঁটকি, গ্রামবাংলার পিঠাপুলি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবারও এ জেলার খাদ্যসংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ।চলুন, জেনে নেওয়া যাক নেত্রকোনা জেলার বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী কিছু খাবার সম্পর্কে।১. নেত্রকোনার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টিনেত্রকোনা জেলার সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার হলো বালিশ মিষ্টি। এটি দেখতে অনেকটা বালিশের মতো হওয়ায় এর নাম রাখা হয়েছে বালিশ মিষ্টি। অনেকে একে ভালোবেসে 'গয়ানাথের বালিশ' বলেও ডাকেন।প্রায় একশ বছরেরও বেশি সময় আগে গয়ানাথ ঘোষ নামের একজন মিষ্টি প্রস্তুতকারক এই বিশেষ মিষ্টি তৈরি করেন। এরপর ধীরে ধীরে এর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।দুধের ছানা, চিনি ও ময়দা দিয়ে তৈরি করা হয় এই মিষ্টি। প্রথমে ছানার মণ্ড তৈরি করে বালিশের মতো আকৃতি দেওয়া হয়। এরপর চিনির গরম রসে ভিজিয়ে রাখা হয় এবং পরিবেশনের আগে ওপরে ঘন ক্ষীর বা দুধের মালাইয়ের প্রলেপ দেওয়া হয়।২০২৫ সালে নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। ফলে এটি এখন শুধু নেত্রকোনার গর্ব নয়, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসম্পদেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।নেত্রকোনা শহরের বারহাট্টা রোডের গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভান্ডার এই মিষ্টির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ২. হাওরের তাজা মাছনেত্রকোনা একটি হাওরসমৃদ্ধ জেলা। বিশেষ করে মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী ও মদন অঞ্চলের হাওরগুলো মাছের জন্য পরিচিত।এ অঞ্চলে রুই, কাতলা, বোয়াল, শোল, টাকি, পুঁটি, মাগুর ও শিংসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যায়।মাছ দিয়ে তৈরি ঝোল, ভুনা, দোপেঁয়াজা এবং মাছের ভর্তা স্থানীয় মানুষের খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গরম ভাতের সঙ্গে হাওরের তাজা মাছের ঝোল খাওয়ার স্বাদ সত্যিই অসাধারণ।৩. নেত্রকোনার শুঁটকিনেত্রকোনার হাওর অঞ্চলে মাছ সংরক্ষণের একটি পরিচিত পদ্ধতি হলো শুঁটকি তৈরি। বিশেষ করে শীত মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের মাছ শুকিয়ে শুঁটকি প্রস্তুত করা হয়।শুঁটকি ভর্তা, শুঁটকি ভুনা এবং শাকসবজির সঙ্গে শুঁটকি রান্না স্থানীয় খাবারের পরিচিত পদ। সরিষার তেল, পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ দিয়ে তৈরি শুঁটকি ভর্তা গরম ভাতের সঙ্গে বেশ উপাদেয়।নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতে শুঁটকির রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।৪. গারো জনগোষ্ঠীর বাঁশকোরলের খাবারনেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা অঞ্চলে গারোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তাঁদের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি এ জেলার খাবারের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।বাঁশের কচি অংশ বা বাঁশকোরল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পদ তাঁদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা বাঁশকোরলের তরকারির স্বাদ ও ঘ্রাণ সাধারণ তরকারির চেয়ে আলাদা।এ ছাড়া স্থানীয় শাকসবজি, মাছ ও মাংস দিয়ে তৈরি নানা ধরনের খাবারও তাঁদের খাদ্যসংস্কৃতির অংশ।৫. নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলিশীতকাল এলেই নেত্রকোনার গ্রামাঞ্চলে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। নতুন ধানের চালের গুঁড়া, নারকেল, খেজুরের গুড় ও দুধ দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের পিঠা।এ অঞ্চলে প্রচলিত জনপ্রিয় পিঠাগুলোর মধ্যে রয়েছে—ভাপা পিঠাচিতই পিঠাপাটিসাপটাদুধচিতইপুলি পিঠাপাকান পিঠাতেলের পিঠাবিশেষ করে খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি ভাপা পিঠা ও দুধচিতই শীতের খাবারের অন্যতম আকর্ষণ।৬. খেজুরের গুড় ও পায়েসশীত মৌসুমে খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় গ্রামবাংলার একটি জনপ্রিয় উপাদান। নেত্রকোনার বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকাতেও খেজুরের গুড় দিয়ে পায়েস, পিঠা ও মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরি করা হয়।নতুন চালের পায়েসের সঙ্গে খেজুরের গুড় মিশিয়ে তৈরি খাবার শীতের দিনে বিশেষ আনন্দ এনে দেয়।৭. দেশি হাঁসের মাংস ও চালের রুটিনেত্রকোনার হাওর ও গ্রামীণ জনপদে হাঁস পালনের প্রচলন রয়েছে। তাই হাঁসের মাংস এ অঞ্চলের অনেক পরিবারের পছন্দের খাবার।মসলা দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে রান্না করা হাঁসের মাংসের সঙ্গে গরম চালের রুটি কিংবা ভাত পরিবেশন করা হয়। শীতকাল, বিয়ে ও বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে এ ধরনের খাবারের আয়োজন দেখা যায়।৮. বিভিন্ন ধরনের ভর্তা ও শাকসবজিনেত্রকোনার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাবারে ভর্তার বিশেষ স্থান রয়েছে। গরম ভাতের সঙ্গে আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা, টমেটো ভর্তা, ডাল ভর্তা ও বিভিন্ন শাকের ভর্তা খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।স্থানীয় মৌসুমি শাকসবজি দিয়ে তৈরি নানা পদও এখানকার খাদ্যসংস্কৃতির অংশ।নেত্রকোনার খাবারের বিশেষত্বনেত্রকোনার খাবারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্য। একদিকে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বালিশ মিষ্টি, অন্যদিকে হাওরের তাজা মাছ ও শুঁটকি, আবার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রান্না—সব মিলিয়ে এ জেলার খাদ্যসংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ।বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মাছ এবং পাহাড়ি এলাকার প্রাকৃতিক উপকরণভিত্তিক খাবার নেত্রকোনাকে অন্যান্য জেলা থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।নেত্রকোনা জেলা শুধু হাওর, পাহাড়, নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এর রয়েছে সমৃদ্ধ খাদ্যঐতিহ্য। তবে এ জেলার সবচেয়ে বড় পরিচিতি হলো শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বালিশ মিষ্টি, যা ২০২৫ সালে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন করে নতুনভাবে জাতীয় পরিচিতি লাভ করেছে।আপনি যদি কখনো নেত্রকোনা ভ্রমণে যান, তাহলে গয়ানাথের বিখ্যাত বালিশ মিষ্টির স্বাদ নিতে ভুলবেন না। পাশাপাশি হাওরের তাজা মাছ, শুঁটকি এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারও চেখে দেখতে পারেন।কারণ নেত্রকোনার খাবারের স্বাদ গ্রহণ মানে শুধু নতুন কিছু খাওয়া নয়, বরং এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়া।

নেত্রকোনা জেলার বিখ্যাত খাবার